যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার জন্য চলমান আলোচনা থেমে যাওয়ায় ইরান এখন ‘পুরোপুরি আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গতকাল সোমবার রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়ে দিয়েছে, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল আবার শুরু করার যে চেষ্টা চলছিল, তা এখন কার্যত থেমে গেছে। ফলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়।
ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। তাই ইরানের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, ইরান কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রয়োজন হলে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তিনি আরও জানান, কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভেঙে দিতে ইরান সময় বুঝে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সামরিক হামলা চালাবে।
যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। ওই চুক্তিতে দুই দেশকে সোমবারের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সময় দেওয়া হয়েছিল। ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটি বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ‘অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে’ বন্ধ করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি বেশিদিন টেকেনি। এর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG-এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। তাই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ যুদ্ধকে আবারও উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়।
সোমবার সাংবাদিকেরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, জুনের অস্থায়ী চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো চেষ্টা করছে কি না। ট্রাম্প সরাসরি বলেন, না।
তবে কূটনৈতিকভাবে একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে গোপন যোগাযোগের চ্যানেল খুলেছে। যুদ্ধের সময় আইআরজিসি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং দেশটির অর্থনীতির বড় একটি অংশের ওপরও এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস দুইটি সরাসরি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, সাবেক মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর তুলসি গ্যাবার্ড ইরাকের একজন কুর্দি নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই কুর্দি নেতার আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল আহমাদ ভাহিদির কাছে একটি বার্তা পাঠায়।
পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানায়, একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেই এই যোগাযোগের খবর নিশ্চিত করেছেন। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় উদ্বেগ ছিল, আলোচনার টেবিলে থাকা ইরানি প্রতিনিধিরা আসলে আইআরজিসির হয়ে কথা বলছেন কি না। এরই মধ্যে রয়টার্স জানিয়েছিল, জেনারেল ভাহিদি ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ভাহিদি পরে জানান যে তিনি ইরানের আলোচকদের অবস্থানের সঙ্গে একমত এবং তাদের সঙ্গে তার সমন্বয় রয়েছে।
ট্রাম্পের জামাতা এবং বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারও সোমবার ফক্স নিউজ চ্যানেলের প্রধান বৈদেশিক সংবাদদাতা ট্রে ইয়িংস্টের সঙ্গে আলাদা এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। কুশনার বলেন, তিনি আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারবেন না। তবে তার ভাষায়, ইরান সরকারের বিভিন্ন অংশ ও বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে মার্কিন সরকারের যোগাযোগ সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি বিস্তৃত।
অর্থাৎ, প্রকাশ্যে শান্তি আলোচনা থেমে গেলেও পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ এবং অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতির কারণে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার পথ এখনো অনিশ্চিত।