হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সরকারপন্থী সবচেয়ে বড় সমাবেশ, লাখো মানুষের উপস্থিতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানের বাজিস মিলিশিয়া বাহিনীর নারী সদস্যরা মিছিলে। ছবি: এএফপি

যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর গত শুক্রবার ইরানে সরকার আয়োজিত এক বড় সমাবেশে অংশ নেন লাখো মানুষ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে এটিই এ ধরনের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। এতে অংশ নেওয়া মানুষ দেশ রক্ষায় অস্ত্র হাতে নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবি আল–জাদিদ বা নিউ আরবের খবরে বলা হয়েছে—ইরান সরকার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং তেহরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

সীমিত সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ রক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য কত মানুষ স্বেচ্ছাসেবী হয়েছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের হিসাব পাওয়া গেছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জানফাদায়ে ইরান’, যার অর্থ ‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গকারীরা।’

স্বেচ্ছাসেবীরা তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকার সড়ক দিয়ে সামরিক পোশাক পরে মিছিল করেন। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। পথের পাশে থাকা মানুষ তাদের দেখে উল্লাস করেন। কয়েক দিন ধরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জনগণকে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় রাইফেলসহ অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। নতুন এই স্বেচ্ছাসেবীরা ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড এবং এর স্বেচ্ছাসেবী শাখা বাসিজের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তার জন্য আরও একটি স্তর হিসেবে কাজ করবেন।

তেহরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, ৬ লাখের বেশি মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। প্রশিক্ষণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার সকালে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি অনুমান করে জানায়, ৩ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।

সমাবেশ শুরুর সময় দেওয়া এক বক্তব্যে বাসিজের নতুন প্রধান হোসেইন তাইয়েব বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা ‘পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষার’ জন্য প্রস্তুত থাকবেন। শিগগিরই ইরানের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি জানান। তাইয়েব আরও বলেন, নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ইরানের শত্রুদের জন্য একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে উঠবে। এ সময় প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, সামরিক কমান্ডার এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিছিলটি দেখছিলেন।

সমাবেশে অংশ নেওয়া কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা পায়ে মাড়ান। কেউ কেউ ‘আমেরিকার মৃত্যু চাই’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দেন। ২৪ বছর বয়সী মারজিয়ে আফাগি তাঁর ছোট সন্তান ও স্বামীর সঙ্গে সমাবেশে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পকে বলতে এসেছি—আমাদের মাতৃভূমির বিরুদ্ধে তাঁর হুমকিতে আমরা ইরানিরা ভয় পাই না। ইতিহাসে কেউই ইরান আক্রমণ করে সেখানে থেকে যেতে পারেনি।’

এই সমাবেশে ইরান সামরিক সরঞ্জামও প্রদর্শন করে। সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখানো হয়। কালো মাথার স্কার্ফ পরা নারী রেভল্যুশনারি গার্ড সদস্যদের ট্রাকের ওপর স্থাপিত মেশিনগানের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। রেভল্যুশনারি গার্ড তাদের ড্রোনও প্রদর্শন করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের বিরুদ্ধে এসব ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে উপসাগরীয় এলাকা থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুক্রবারের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে তাইয়েবের মতো কট্টরপন্থীরা ভবিষ্যতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো বিক্ষোভ হলে তা দমন করতে আরও বেশি প্রস্তুত থাকবে। যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে, জানুয়ারিতে ইরানে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দেশব্যাপী বিক্ষোভগুলোর একটি হয়েছিল। অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ পরে আরও বিস্তৃত অসন্তোষে রূপ নেয়।

মে মাসে ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ অনলাইন ফর্ম পূরণ করে অথবা বিভিন্ন জনসমাবেশে অংশ নিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করার স্বেচ্ছাসেবী হয়েছেন।