মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলকে জানিয়েছেন, ইরানে যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি যেন খুব দ্রুত এবং চূড়ান্ত আঘাত হয়। তিনি সপ্তাহ বা মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকা কোনো যুদ্ধ চান না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এক মার্কিন কর্মকর্তা, আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি এবং হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) যদি কিছু করেন, তাহলে সেটি হতে হবে চূড়ান্ত।’ তবে এখনো পর্যন্ত ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাঁকে নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে, মার্কিন সামরিক হামলার পর ইরানের শাসকগোষ্ঠী দ্রুত ভেঙে পড়বে কি না।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি জানান, এ নিয়েই মূলত সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ আছে যে, ইরান যদি আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ওই অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সব সামরিক সক্ষমতা নাও থাকতে পারে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রথমে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারের সামরিক অভিযান অনুমোদন করতে পারেন। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বাড়ানোর সুযোগ তিনি হাতে রাখতে চান—যদি তিনি আদৌ কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং বুধবার বিকেল পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মঙ্গলবার ডেট্রয়েটে সফরের সময় ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সাহায্য যাচ্ছে।’ তিনি ইরানের পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ বলেও মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বুধবার বিকেলে ওভাল অফিসে দেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেন।
সেখানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে ইরানি সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করেছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনাও স্থগিত রেখেছে। ট্রাম্প আগেই বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা অন্য পক্ষের খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থেকে তথ্য পেয়েছি। তারা বলেছে, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। আমি আশা করি এটি সত্য। কে জানে?’
সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এখন শেষ কি না—এ প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা দেখব, পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।’ এক মার্কিন কর্মকর্তা, আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি এবং হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রস্তুত। তিনি বারবার বলেছেন, শাসকগোষ্ঠী উৎখাতে তাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
মঙ্গলবার তিনি তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলকে জানান, ইরানে সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ থেকে তিনি কী ফল চান। সেই অনুযায়ী প্রতিরক্ষা দপ্তর বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এ তথ্য দিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা, আরেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি। এসব পরিকল্পনা বুধবার ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপনের কথা ছিল বলে জানান প্রথম মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি।
ইরান বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর সহকারীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে।’ তিনি যোগ করেন, গত বছর ইরানে এবং এ মাসে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রমাণ হয়েছে, ‘তিনি যা বলেন, সেটাই করেন।’
হোয়াইট হাউসের আরেক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার বিকেলে মিশিগান থেকে ফেরার পর ট্রাম্প ইরান বিষয়ক এক বৈঠকে যোগ দেন। ওই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বৈঠকে ট্রাম্পকে ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সর্বশেষ আনুমানিক সংখ্যা সম্পর্কে জানানো হয় এবং তিনি এ বিষয়ে আরও তথ্য চান।
এক মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরেক ব্যক্তি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ট্রাম্পের জন্য সামরিক বিকল্প প্রস্তুত করেছিল। সেগুলো সাম্প্রতিক দিনে তাঁর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং পরে আরও পরিমার্জন করা হয়েছে। এর আগে, এই সপ্তাহে ইরান নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করেন—ইরানে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্য কী হবে এবং তেহরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
আলোচনায় একটি বড় উদ্বেগ হলো—কয়েক সপ্তাহের দেশজুড়ে বিক্ষোভে দুর্বল হয়ে পড়া এবং সম্ভাব্য পতনের মুখে থাকা ইরানি শাসকগোষ্ঠী প্রতিশোধের ক্ষেত্রে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনা এবং ইসরায়েলের মতো মিত্ররা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কথা জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা, হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি এবং আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি।
জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর—যেটি ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে পরিচিত—ইরান কাতারের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। সে সময় ট্রাম্প প্রশাসন আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
বুধবার কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে শত শত মার্কিন সেনা নিরাপদ স্থানে সরে যান, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পদক্ষেপের জবাবে ইরান হামলা চালালে তারা নিরাপদ থাকে। একাধিক সূত্র জানায়, পুরো অঞ্চলে সেনা, বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর আগে যেমন বড় পরিসরে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করা হয়েছিল, এবার তেমন কিছু করেনি যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইরানে লক্ষ্যভিত্তিক বা সীমিত হামলা চালানোর মতো বিমান, জাহাজ এবং সেনাসদস্য এখনো ওই অঞ্চলে রয়েছে।