ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভয়াবহ সংকটের মধ্যে একটি সাধারণ লাইটারও এখন হয়ে উঠেছে জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। রান্না, রুটি তৈরি, পানি গরম করা কিংবা শিশুর জন্য এক কাপ দুধ—সবকিছুর শুরু আগুন দিয়ে, আর সেই আগুন জ্বালাতে প্রয়োজন একটি লাইটার।
রোববার (১৬ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে আল-জাজিরা জানিয়েছে, গাজার ৪৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা রাবাব দেইফাল্লাহর কাছে এখন পুরোনো একটি জীর্ণ লাইটার অত্যন্ত মূল্যবান। কাঠের চুলায় আগুন ধরাতে তিনি বারবার সেটি চাপেন। যুদ্ধ শুরুর পর নতুন লাইটার কেনা কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁর ছেলে কয়েকবার সেটি মেরামত করেছে।
রাবাব বলেন, ‘আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পুরোটাই আগুনের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আগুন জ্বালানোর শুরুটা একটি লাইটার দিয়ে, আর এই ছোট জিনিসটিই এখন গাজায় পাওয়া সবচেয়ে কঠিন জিনিসগুলোর একটি।’
যুদ্ধের আগে তিনটি লাইটার মাত্র এক শেকেলে পাওয়া যেত। এখন একটি নতুন লাইটারের দাম ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা। নতুন কেনার বদলে পুরোনো লাইটারটি মেরামত করতেই রাবাবকে সর্বশেষ ১২ ডলার খরচ করতে হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘এই টাকা কি লাইটারের পেছনে খরচ করব, নাকি এক ব্যাগ আটা কিনব?’
লাইটারের সংকটে অনেক পরিবার এখন মহা মূল্যবান এই বস্তুটিকে একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে। কখনো প্রতিবেশীর জ্বলন্ত আগুন থেকে একটি কার্ডবোর্ডে আগুন নিয়ে আসতে হচ্ছে। কখনো প্রতিবেশীর চুলায় গিয়ে খাবার রান্না করতে হচ্ছে। লাইটার না পেলে কোনো কোনো পরিবার দিনের পর দিন ঠান্ডা খাবার খেতেও বাধ্য হচ্ছে।
একই সংকটে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মানসুর। জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ছয় সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই নারী মাটির চুলায় খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন। কিন্তু গ্যাসের সংকট এবং লাইটারের অভাবে তাঁর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। হাসনা বলেন, গ্রাস থাকলে চুলা জ্বালাতে সামান্য স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট, কিন্তু মাটির চুলায় আগুন ধরাতে লাইটারের মতো স্থিতিশীল আগুন প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ ও সীমান্তপথ বন্ধ থাকায় গাজায় প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৩০ হাজারের বেশি ট্রাক প্রবেশ করলেও দৈনিক গড়ে ১৯১ টির বেশি ট্রাক ঢোকেনি—যা যুদ্ধের আগের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
লাইটার না পাওয়ায় গাজায় নতুন একটি পেশারও জন্ম হয়েছে—লাইটার মেরামত। আল-কারমেল স্কুলের কাছে ছোট দোকান বসিয়ে ২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাওয়িশ এখন এই কাজ করেই পরিবার চালান। নষ্ট লাইটার থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্য লাইটারে ব্যবহার করেন তিনি।
তামের বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের এমন কাজ করতে বাধ্য করেছে, যেসব কাজের কথা আমরা আগে কখনো ভাবিনি।’
বাস্তুচ্যুত বাবা শাদি আবু শামলা বলেন, একটি স্কুলে অসংখ্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। অথচ সেখানে মাত্র চারটি লাইটার আছে। সেগুলো এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে ঘুরে বেড়ায়। তিনি বলেন, ‘লাইটার এখন জীবনের মেরুদণ্ড। আপনার তাঁবুতে লাইটার থাকলে আপনি ঠিক আছেন। না থাকলে আপনি আটকে গেছেন।’
গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তাই কখনো কখনো একটি ছোট লাইটারের মূল্য দিয়েও মাপা যায়—যে লাইটারটি একটি পরিবারের খাবার, উষ্ণ পানি কিংবা শিশুর জন্য এক কাপ দুধের আশার আলো জ্বালায়।