কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তবে তা থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ বা ইউক্রেন সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট খোলার আশঙ্কা আপাতত নেই। কঠোর কূটনৈতিক প্রতিবাদ, জাতিসংঘে নিন্দার আহ্বান এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার হুঁশিয়ারির পাশাপাশি তেহরান স্পষ্ট করেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়ানোর কোনো আগ্রহ তাদের নেই।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। গতকাল শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে এক নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। ইরান এই হামলাকে ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, দেশটি তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে তেহরান ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-এর বরাতে জানা যায়, তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় হামলাটিকে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ আখ্যা দিয়ে এটিকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
এই নিন্দার মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করছে, যাতে তেহরান ওই অঞ্চলে হামলা পরিচালনা করতে পারে। এর আগে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনের বাহিনী কাস্পিয়ান সাগরে একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ এবং ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জুলাই মাসের শুরু থেকে ইউক্রেন লক্ষ্য করেছে যে, রাশিয়া উপসাগরীয় দেশগুলো এবং সেখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর সক্রিয় উপগ্রহ নজরদারি চালাচ্ছে। তাঁর দাবি, এসব উপগ্রহচিত্র পরবর্তী সময়ে ইরানের হাতে পৌঁছে যায়।
জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘রাশিয়ার উপগ্রহচিত্র এবং ইরানের হামলার মধ্যে একটি স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। হামলার আগে প্রস্তুতির জন্য, হামলার সময় এবং হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ক দেখা যায়।’ তিনি দাবি করেন, শুধু ১৯ ও ২০ জুলাই রাশিয়ার উপগ্রহ নজরদারির আওতায় ছিল চারটি বিমানঘাঁটি। এর মধ্যে দুটি বাহরাইনে, একটি জর্ডানে এবং একটি কুয়েতে অবস্থিত।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে কিয়েভকে রাশিয়ার ব্যবহৃত ইরানি নকশার ড্রোনের মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার শিকার দেশগুলোর কাছে ড্রোন প্রতিরোধে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে ইউক্রেন।
এদিকে পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম। তবে ভবিষ্যতে এমন হামলার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যা তেহরানের গভীর উদ্বেগেরই প্রতিফলন। আলাদা এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ওই আলোচনায় তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং এর নিন্দা জানাতে আহ্বান জানান।
আরেক পৃথক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় শুধু নিন্দা জানিয়েই থেমে থাকেনি, তারা ইউক্রেনের ‘শত্রুতাপূর্ণ’ মনোভাবের বিষয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মুখোমুখি, যা তাদের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার কোনো ‘আগ্রহ ইরানের নেই।’ একই সঙ্গে তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে, প্রয়োজন হলে ইরান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেও আগ্রহী।
তবে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধসামগ্রীর লেনদেন রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। ইরান বারবার বলছে, তারা এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে বা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে চায় না, বরং সংঘাতের উত্তেজনা কমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকেই তাদের স্পষ্ট আগ্রহ রয়েছে।