মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতকে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ রূপ দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ও ব্যাপক পরিসরে ‘ভয়াবহ সামরিক হামলা’ চালানো হবে কিনা—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি একটি বিশাল হামলার কথা বিবেচনা করছি, যা এর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় হবে। আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি এবং আমরা এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’
ট্রাম্প এমন সময়ে এই কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ফের ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সম্ভাব্য এই পদক্ষেপের পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি অনুরোধ করলে ইসরায়েল দুই মিনিটের মধ্যে এই হামলায় যোগ দেবে, তবে আমাদের কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আকস্মিক বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দেশটির উত্তর-পশ্চিম এলাকা, রাজধানী তেহরান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিসম ও বান্দর আব্বাসের হরমুজ প্রণালী বরাবর একের পর এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য যে চরম এক অতল গহবরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য আজ অকল্পনীয় এক ভয়াবহ পরিণতির প্রান্তে দাঁড়িয়ে। অঞ্চলটি মুখোমুখি সংঘাতের ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা একটি চক্রের মধ্যে টেনে নেওয়া হচ্ছে। এক সংকট অন্য সংকটকে উসকে দিচ্ছে এবং সংঘাতের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো যুদ্ধের ভিড়ে অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।’
পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি দেখে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে ইরান থেকে তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং জার্মানি লোহিত সাগর থেকে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষের জন্য ‘বোমা হামলার আশ্রয়কেন্দ্র’ খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ওই অঞ্চলে অবস্থানরত আমেরিকানদের ফ্লাইট বাতিলের সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
উল্লেখ্য, লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি হুতি মিলিশিয়া বাহিনী দুটি সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর পর ট্রাম্পের এই কঠোর হুমকি আসে। ধারণা করা হচ্ছে, সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী স্থবির হয়ে পড়ায় সৌদি আরব যে বিকল্প পথ (ইয়ানবু বন্দর) ব্যবহার করে এশিয়ায় তেল রপ্তানি করছিল, হুতিরা সেখানে অবরুদ্ধ সৃষ্টি করতেই বাব আল-মানদেব প্রণালীকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, সম্প্রতি তেহরান থেকে ইয়েমেনে রিভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) কর্মী ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একটি পৃথক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ট্রাম্প জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে আমেরিকার সহায়তা পেতে হলে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর অধীনে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া রিয়াদ এ বিষয়ে কোনো আপস করবে না বলে আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন এক রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত যুদ্ধ গড়াচ্ছে।