হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিমানবাহী রণতরি বানাচ্ছে তুরস্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

তুরস্কের বিমানবাহী রণতরী মুগেমের একটি রেপ্লিকা। ছবি: উইকিপিডিয়া

বিশ্বের নজর যখন হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে আটকে, তখন তুরস্কের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো ব্যস্ত দেশটির প্রথম বিমানবাহী রণতরি ‘মুগেম’ নির্মাণে। তুরস্কের নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল এরকুমেন্ত তাতলোইগু গত সপ্তাহে জানান, এই রণতরির নির্মাণকাজ আগামী বছরের শেষের দিকে সম্পন্ন হবে। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।

অ্যাডমিরাল এরকুমেন্ত তাতলোইগুর এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটির হুল বা মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ ঘোষিত সময়সূচির প্রায় এক বছর আগেই শেষ হবে। দেশটির ইতিহাসে নির্মিত সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজটি প্রায় ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন হবে এবং এর দৈর্ঘ্য হবে ২৮৫ মিটার। এটি ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরি শার্ল দ্য গলকে ছাড়িয়ে যাবে, যার দৈর্ঘ্য ২৬১ মিটার এবং ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৫০০ টন। এত দিন এই রণতরিটিই ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপ হিসেবে বিবেচিত ছিল। নতুন জাহাজটিতে ৬০টি বিমান রাখার ব্যবস্থা থাকবে এবং এতে স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন সক্ষমতা (শর্ট টেক-অফ সিস্টেম) থাকবে।

আঙ্কারার অনেকের কাছে এই প্রকল্পের দ্রুত অগ্রগতি একটি স্পষ্ট বার্তা তুরস্ক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ২০২৫ সালের আগস্টে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল।

সম্প্রতি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ইসরায়েলের সরকার ও বিরোধী শিবির—দুই পক্ষের নেতারাই তাঁদের বক্তব্যে ক্রমশ তুরস্ককে ইরানের সঙ্গে তুলনা করছেন। ইসরায়েলের জনপ্রিয় বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেত—যিনি ভবিষ্যতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত—গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের এক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘তুরস্ক হচ্ছে পরবর্তী ইরান।’

ইসরায়েল-ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে দুই দফা যুদ্ধের পর আঙ্কারা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা, মানববিহীন প্ল্যাটফর্ম এবং পঞ্চম প্রজন্মের কান যুদ্ধবিমান উৎপাদন প্রকল্পে গতি বাড়িয়েছে। তুরস্কের নৌক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা গবেষক মেইসুন ইয়াসার বলেন, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান জোট তুরস্ককে নৌ সক্ষমতার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করছে।

সাধারণত এই ধরনের বিমানবাহী রণতরি খোলা সমুদ্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়। তবে ইয়াসারের মতে, আঙ্কারা ‘মুগেম’কে এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখছে, যা অঞ্চলের সম্ভাব্য শত্রুদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘গ্রিক সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের সম্পর্ক উষ্ণ হয়ে ওঠায় এই জোট খুবই কার্যকর হয়ে উঠেছে এবং তাদের অবস্থান ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। এই বিমানবাহী রণতরি একদিকে অতিরিক্ত সক্ষমতা, অন্যদিকে কৌশলগত প্রয়োজন।’

তুরস্কে বিমানবাহী রণতরি নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। তুরস্কের নৌবাহিনীর সাবেক অ্যাডমিরাল ইয়ানকি বাগসিওগোলু বলেন, ১৯৯৩ সালে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল, যেখানে খোলা সমুদ্রে মোতায়েনের জন্য হালকা বিমানবাহী রণতরি, উভচর হামলাকারী জাহাজ এবং আন্তমহাসাগরীয় শক্তি প্রদর্শনের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি জানান, ২০১৭ সালের দিকে নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গবেষণার পর প্রকল্পটি বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে। তাঁর ভাষায়, ‘বিমানবাহী রণতরির প্রয়োজনীয়তা তখন সামনে আসে।’

মূল পরিকল্পনায়, যার মধ্যে আঙ্কারার ড্রোনবাহী জাহাজ টিসিজি আনাদোলুও ছিল, পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে তুরস্ককে ওই কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয় দেশটি। বর্তমানে তুর্কি সামরিক বাহিনী এই জাহাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে স্টেলথ সক্ষমতা সম্পন্ন মানববিহীন যুদ্ধবিমান ‘কিজিলেলমা’, ‘হুরজেট’ হালকা যুদ্ধবিমান এবং কান পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য নৌ সংস্করণ। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়তায় স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন সক্ষম বায়রাকতার টিবি ৩ ড্রোনও মোতায়েন করা হবে।

তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত আলপার কোশকুন বলেন, বিমানবাহী রণতরি প্রকল্পটি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে তুরস্কের শক্ত অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতার আরেকটি প্রমাণ। বর্তমানে ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কোশকুন বলেন, এই রণতরি ন্যাটোর ভেতরে তুরস্কের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর ভাষায়, ‘এতে তুরস্কের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। তবে এর খরচও আছে। এটি অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং নতুন হুমকির ধারণা তৈরি করতে পারে।’

তুরস্কের প্রতিপক্ষ ইসরায়েলের নৌ সক্ষমতা সীমিত এবং তা মূলত গাজায় নৌ অবরোধ বজায় রাখা কিংবা বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনার ওপর কেন্দ্রীভূত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ বড় আকারের নৌযানগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে—বিশেষ করে ছোট ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে, এমনকি বিমানবাহী রণতরিগুলোর ক্ষেত্রেও।

গত বছরের এপ্রিলে, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এড়াতে উচ্চগতির কৌশলগত মোড় নেওয়ার সময় মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যান থেকে একটি এফ/এ–১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরে পড়ে যায়। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের সময়ও মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলো মূলত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতের সীমার বাইরে অবস্থান করেছিল।

তুরস্কের প্রস্তাবিত বিমানবাহী রণতরিটিতে হুমকি মোকাবিলায় ভার্টিক্যাল লঞ্চিং সিস্টেম, ক্লোজ-ইন ওয়েপনস সিস্টেম এবং রিমোট ওয়েপনস সিস্টেমের মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত থাকার কথা রয়েছে। ইস্তাম্বুল শিপইয়ার্ড কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রিসেপ এরদিনচ ইয়েতকিন মার্চে তুর্কি টিভিকে জানান, প্রকল্পটির অগ্রগতি এত দ্রুত যে তাঁরা ইতিমধ্যে ফ্লাইট র‍্যাম্প তৈরি করে ফেলেছেন, যা এ বছরের মধ্যেই একটি বিমানবন্দরে পরীক্ষা করা হবে।

একাধিক শিপইয়ার্ড একসঙ্গে মেগা-ব্লক তৈরি করতে পারায় জাহাজটি দ্রুত নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

দুই মাসে ইসরায়েলে ১.১৫ লাখ টন অস্ত্র–গোলাবারুদ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা

হরমুজে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে: মোজতবা খামেনি

আবার হামলার চিন্তা ট্রাম্পের, বেদনাদায়ক পাল্টা আঘাতের হুমকি ইরানের

ইরান এমন অস্ত্র বের করবে, যা দেখে ‘শত্রু হার্ট অ্যাটাক’ করতে পারে

গাজা অভিমুখী সুমুদ ফ্লোটিলা আটকাতে শুরু করেছে ইসরায়েল

অবরোধ বহাল রাখতে অনড় ট্রাম্প, কার্যকর ও নজিরবিহীন জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব: ইরানের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির হাতে

তেল রাখার জায়গা ফুরিয়ে আসছে ইরানের, বন্ধ হতে পারে উৎপাদন

দুর্নীতি মামলার জেরার মধ্যে অজুহাত দেখিয়ে এজলাস ছাড়লেন নেতানিয়াহু

তেলের পর মধ্যপ্রাচ্যের মেঘও কি চুরি করছে যুক্তরাষ্ট্র