জেরুজালেমে মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স ইসরায়েলের দখলে চলে যাওয়ার ‘আসন্ন’ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে জর্ডান। এই পরিস্থিতিতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বুধবার (৫ আগস্ট) একটি জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে দেশটি। জর্ডানের আশঙ্কা, আল-আকসার বর্তমান ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার যেকোনো চেষ্টা বৃহত্তর ধর্মীয় সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে।
জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি জানিয়েছেন, আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অব দ্য রকের আশপাশের চত্বরে ইসরায়েলি উগ্র ইহুদি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ২৩ জুলাই ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বে ধর্মীয় ডানপন্থী ও বসতিস্থাপনকারীসহ দুই হাজারের বেশি ইসরায়েলি ওই এলাকায় প্রবেশ করে প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার পালন করেন। জর্ডানের কর্মকর্তারা এটিকে আধুনিক ইতিহাসে আল-আকসার বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত এই পবিত্র স্থানে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘স্ট্যাটাস কো’ বা প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় মুসলিমরা সেখানে নামাজ আদায় করতে পারেন, কিন্তু ইহুদিদের সেখানে প্রার্থনা করার অনুমতি নেই। এই ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবারের হাতে রয়েছে।
সাফাদি বলেন, এই ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা শুধু জর্ডান বা ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মুসলিম বিশ্বে এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘জেরুজালেম একটি বারুদের স্তূপ।’ বুধবারের বৈঠকে আরব লীগের দেশগুলোর পাশাপাশি তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জর্ডান আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে আল-আকসা ঘিরে ইহুদি ধর্মীয় ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগের খবরে। আগামী সেপ্টেম্বরে ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবের সময় ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী নেতারা জর্ডানের ঐতিহাসিক তত্ত্বাবধানকে আরও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে আম্মান।
আল-আকসা ইস্যুতে উত্তেজনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০০০ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন ডানপন্থী নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের আল-আকসা প্রাঙ্গণ পরিদর্শনের পর দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়, যা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সহিংসতা সৃষ্টি করে।
এর পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কাও করছে জর্ডান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের জর্ডানে ঠেলে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা তাদের দেশের জন্য ‘রেড লাইন’। এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি জর্ডানের অর্থনীতি, রাজনীতি ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়েও জর্ডানের সম্পর্কের টানাপড়েন বেড়েছে। ইসরায়েল ২০২১ সালের একটি চুক্তি নবায়ন না করে জর্ডানকে আগের চুক্তি অনুযায়ী কম পরিমাণ পানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের সমালোচনার কারণে জর্ডানে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার বিরোধিতাও বাড়ছে।
জর্ডানের রাজনৈতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির কয়েক শ বিশিষ্ট রাজনীতিক, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এই সামরিক উপস্থিতি জর্ডানকে এমন একটি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যার সঙ্গে দেশটির সরাসরি কোনো পক্ষপাত নেই।