ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তারা এই গোষ্ঠীটির সশস্ত্র শাখা পরিচালনা করছেন এখন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবেই তারা এই দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল শনিবার এমনটাই জানিয়েছে সৌদি আরবের গণমাধ্যম আল অ্যারাবিয়া। একই সময়ে লেবাননের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তাদের দেশ আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
হিজবুল্লাহ–ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির কয়েকজন কর্মকর্তা সম্প্রতি ইরান থেকে লেবাননে এসেছেন। তাদের কাজ হচ্ছে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা। ইসরায়েলের সঙ্গে ১৪ মাসের লড়াইয়ে এই সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সেই লড়াই শেষ হয়।
সূত্রগুলো জানায়, ইরানি কর্মকর্তারা লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহ সদস্যদের সরাসরি ব্রিফিং দিচ্ছেন। তারা আরও বলেন, লেবাননের বেকা উপত্যকার একটি স্থানে আইআরজিসির কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ওই স্থানটি রাতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের শিকার হয়। ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন আহত এবং ১২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, হামলায় হামাস ও হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হিজবুল্লাহ–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, লেবাননের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কেবল সময়ের ব্যাপার।
এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অঞ্চলে সামরিক শক্তি জড়ো করেছেন। তিনি বারবার ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন। প্রথমে গত মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর পদক্ষেপের কারণে তিনি হুমকি দেন। পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও একই ধরনের হুমকি দেন।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে ইরান ইসরায়েলকেও লক্ষ্যবস্তু করবে—এমন ধারণা থেকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থেকে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন–কান শনিবার সন্ধ্যায় জানায়, ইরানে হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন লক্ষণ তেল আবিব শনাক্ত করেছে। বিশেষ করে তাদের রকেট বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানে হামলা হলে হিজবুল্লাহ, আইআরজিসি, ইরান–সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা একযোগে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ সামরিক সূত্রের বরাতে জানায়, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলাগুলো হিজবুল্লাহর সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে। পূর্ব লেবাননে শুক্রবারের হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, তারা হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল–১২ শনিবার জানায়, ট্রাম্প ইরানে হামলার দিকে ঝুঁকছিলেন। তবে তাঁর দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের অনুরোধে তিনি ইরানকে আরও এক–দুদিন সময় দিতে রাজি হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে শুরু হওয়া পরোক্ষ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পারমাণবিক আলোচনায় ইরানকে একটি প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার ট্রাম্প যে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন, সেটি ‘বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত’ নয়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে পুরোপুরি পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ত্যাগ করতে হবে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি হয়তো ইরানকে সীমিত বা প্রতীকী মাত্রার সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম রাখার সুযোগ দিতে পারেন।
গত মাসে লেবাননে ইরান–সমর্থক বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে হিজবুল্লাহ নিরপেক্ষ থাকবে না। তবে তিনি সরাসরি ইসরায়েলকে হুমকি দেননি।
এদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট চলতি সপ্তাহে সূত্রবিহীন এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ হলে ইরান হিজবুল্লাহকে পাশে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী হিজবুল্লাহর ওপর ‘ব্যাপক আঘাত’ হানার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এবং তাদের জানানো হয়েছে, তারা যদি হস্তক্ষেপ করে, তাহলে এবার আঘাত হবে অত্যন্ত কঠোর।
শনিবার লেবাননের হিজবুল্লাহবিরোধী সংবাদমাধ্যম নিদা আল–ওয়াতান দেশটির ‘শীর্ষ রাজনৈতিক সূত্রের’ বরাতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ হলে বৈরুতকে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করতে হবে। এবং হিজবুল্লাহকে লেবাননকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। সূত্রগুলো বলেছে, ‘হিজবুল্লাহ ভেবেছিল, ইরানে হামলা হলে তারা নিরপেক্ষ থাকবে না—এ কথা বলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করা যাবে। কিন্তু ইসরায়েল জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটন থেকে শূন্য ঘণ্টার সংকেত পেলেই তারা আগাম হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাবে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ দেবে না। হিজবুল্লাহ লেবাননকে এই যুদ্ধে টেনে নেবে।’
লেবাননের রাজনীতিতে একসময় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা হিজবুল্লাহ এখন অনেকটাই কোণঠাসা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি–সমর্থিত প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন দায়িত্ব নেন। সাবেক সেনাপ্রধান অউন ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হিজবুল্লাহর বিশাল অস্ত্রভান্ডারের বিরুদ্ধে এক ধরনের পরোক্ষ হুমকি।