হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চুক্তির ১৪টি দফায় কী আছে, তেহরান কী ছাড় পেল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বুধবার দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর করা অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করেছে। যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে হওয়া এই সমঝোতার পরও কঠোর বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে এবং ইরানি কর্মকর্তারাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। একই সময়ে তিনি ইরানকে ঘিরে পূর্বের অন্তত একটি অবস্থানেও কিছুটা নমনীয়তা দেখান। ট্রাম্প বলেন, তেহরানের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য নয়। অথচ এর আগে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি চুক্তি অমান্য করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক জবাব দেবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রত্যাশা সংঘাতে ফেরা নয়, বরং ইরান যেন চুক্তির শর্ত মেনে চলে। একই সঙ্গে ইরানের জনগণকে তিনি ‘বুদ্ধিমান’ বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে দুই দেশের আলোচকেরা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের আশা, এই কূটনৈতিক উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করবে। তবে তিনি আগের এক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ না হলে আবারও শক্তি প্রয়োগের পথ খোলা থাকবে।

প্রকাশ করা নথিতে ১৪টি দফা আছে। সেগুলো হলো—

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা, এই সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে ঘোষণা করছে যে—সব ফ্রন্টে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। তারা এখন থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার অঙ্গীকার করছে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সব ফ্রন্টে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধান নিশ্চিত করা হবে।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করছে।

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও তা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বা প্রতিবন্ধকতা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এই সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের সংখ্যার অনুপাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করছে।

৫. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য কেবল বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে এবং এ জন্য কোনো ফি নেবে না। এই চলাচল পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত এবং উল্টো দিকেও প্রযোজ্য হবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ইরানের মাধ্যমে মাইন অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে তা পূর্ণমাত্রায় চালু করা হবে। ইরান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা কাঠামো নির্ধারণে ওমান সালতানাতের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং এ বিষয়ে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ করবে। এই আলোচনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্য বিধান এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চূড়ান্ত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড়পত্র এবং অনুমোদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

৭. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি পারস্পরিকভাবে সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হবে। এর মধ্যে থাকবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসমূহ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব একতরফা নিষেধাজ্ঞা, তা প্রাথমিক হোক বা গৌণ। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করছে যে, উপরে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় নিষ্পত্তির ইচ্ছা প্রকাশ করছে।

৮. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা উন্নয়ন করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সম্মত হয়েছে, জমাকৃত সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, যা উভয় পক্ষ পারস্পরিকভাবে সম্মত হবে এবং যা সপ্তম অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই প্রক্রিয়ার ন্যূনতম পদ্ধতি হবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানে উপাদানের সমৃদ্ধ অবস্থান হ্রাস করা।

দুই পক্ষ আরও সম্মত হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমৃদ্ধকরণ এবং পারস্পরিকভাবে সম্মত অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে, যা চূড়ান্ত চুক্তিতে একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান স্বীকার করছে যে, উপরে উল্লেখিত পারমাণবিক বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাদের বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত কোনো সামরিক শক্তি মোতায়েন করবে না।

১০. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট উপপণ্য রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র দেবে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেমন ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, পরিবহন ইত্যাদি।

১১. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ সম্পূর্ণ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আলোচনার মাধ্যমে এই তহবিল অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে পারস্পরিকভাবে একমত হবে। এসব তহবিল মূল হিসাবেই থাকুক বা স্থানান্তরিত হোক, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে মনোনীত করবে, তাকে অর্থ প্রদানের জন্য তা সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার অঙ্গীকার করছে যুক্তরাষ্ট্র।

১২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সম্মত হয়েছে যে এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির প্রতিপালন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হবে।

১৩. এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং এই সমঝোতা স্মারকের ১,৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সাপেক্ষে এবং এসব ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কেবলমাত্র অন্যান্য অনুচ্ছেগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় প্রবেশ করবে।

১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

বাংলাদেশ–পাকিস্তানে হামাস সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে তেল আবিব: এনডিটিভিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত

‘যুদ্ধবিরতির’ পরও গাজায় ১ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েল

চুক্তিতে সই ট্রাম্প-পেজেশকিয়ানের, কার্যকর হয়েছে বুধবার থেকেই

ইরান চুক্তির পরপরই ভোটারদের রোষানলে পড়তে চলেছেন নেতানিয়াহু

লেবাননে হিজবুল্লাহর পেছনে শারার সিরিয়াকে লেলিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্পের

হরমুজে মার্কিন অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে গেল ইরানের ৩ ট্যাংকার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ‘১৪ দফার’ চুক্তিতে কী আছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: তেহরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিলের সম্ভাবনা

ইরানের দেখানো কৌশলেই হরমুজ থেকে গোপনে তেল নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের