ইয়েমেনের উপকূলের ছোট্ট দ্বীপ পেরিম যেন ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। চারদিকে পাথর ও বালুর অনুর্বর ভূদৃশ্য। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই দ্বীপই এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সিএনএন জানায়, পেরিম দ্বীপটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত। লোহিতসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্য ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে দ্বীপটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় এটি ভারতে যাতায়াতকারী জাহাজের কয়লা সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমানে পেরিমের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্ত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যদি দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জন করবে তারা। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেব এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিমধ্যে পেরিমের প্রায় ৫০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী মোখা দখল করে নিয়েছে হুতিরা। এর ফলে দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইয়েমেন সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তারিক সালেহ সতর্ক করে বলেছেন, হুতিরা পেরিম দখল করলে তাদের সরাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক ও নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।
২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ এই সংঘাতে ইরান হুতিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা ইসরায়েল ও লোহিতসাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত কয়েক বছরে বাব আল-মান্দেব দিয়ে যাওয়া সমুদ্রপথে বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ সামুদ্রিক তেল-বাণিজ্য চললেও বর্তমানে তার পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক অভিযান শুধু আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নয়, স্থানীয় অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করছে। মোখা বন্দরে হুতিদের রকেট হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল ধ্বংস হয়েছে। বন্দরের কর্মকর্তাদের দাবি, এক হামলায় ১৬ জন নিহত ও ২২ জন আহত হন এবং ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যায়।
এদিকে ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ, ইরান হুতিদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তিসহ আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করছে। সরকারের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পেরিমের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে প্রণালিতে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেনের এই সংঘাত তাই আর কেবল একটি গৃহযুদ্ধ নয়। বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে এর প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ভূরাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ছোট্ট পেরিম দ্বীপটি হয়ে উঠেছে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সম্ভাব্য নতুন ফ্রন্টলাইন।