গাজায় ইসরায়েলের সঙ্গে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে অন্তত একটি করে ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলার মুখে এই যুদ্ধবিরতিকে একটি ‘নিষ্ঠুর ও মারাত্মক বিভ্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সংস্থাটি।
ইউনিসেফ শুক্রবার (১৯ জুন) জানিয়েছে, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে সংঘাত অবসানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ২৬৫টি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, ‘যে সময়টিকে সংযম ও সুরক্ষার সময়কাল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেই সময়েও গত আট মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু প্রাণ হারিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এই অব্যাহত মৃত্যু প্রমাণ করে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি কতটা ফাঁকি ছিল, এটি ফিলিস্তিনি শিশুদের ইসরায়েলি হামলা থেকে কোনো সুরক্ষাই দিতে পারেনি।
‘বিশ্ব যখন যুদ্ধবিরতির ভাষা নিয়ে আলোচনা করছে, গাজার পরিবারগুলো তখনো প্রতিনিয়ত তাদের সন্তানদের দাফন করে চলেছে।’ যোগ করেন জেমস এল্ডার।
জেমস এল্ডার জানান, গাজার শিশুরা তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি, স্কুল ও খেলার মাঠের মতো গণপরিসরে, এমনকি ফুটবল খেলা বা মাছ ধরার সময়ও হামলার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে।
চলতি সপ্তাহের কিছু নির্মম ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সপ্তাহেও একটি দুই বছরের শিশুকে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। পরিবারের তাঁবুর ভেতর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে ১৩ বছরের এক কিশোর। এছাড়া ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক বাবা ও তার পাঁচ বছরের শিশু সন্তান নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুর মিছিল থামছেই না।’
ইসরায়েলের দখলদারিত্বের তথাকথিত সীমানা বা ‘অরেঞ্জ লাইন’ ও ‘ইয়েলো লাইন’-এর ক্রমাগত সম্প্রসারণের দিকে ইঙ্গিত করে এল্ডার বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সীমানার কাছাকাছি একটু অসতর্ক হলেই যে কারও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
তিনি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁবুর ভেতর ১২ বছরের এক কিশোরীর বুকে গুলি লেগেছে এবং নিজের ঘরে থাকা অবস্থায় তিন বছরের এক শিশু কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে ছোঁড়া গুলিতে মুখে আঘাত পেয়েছে।
জাতিসংঘের এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশু গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, যাদের অনেকের আঘাতই অত্যন্ত মারাত্মক।
এল্ডার সতর্ক করে বলেন, শত শত শিশুর জরুরি ভিত্তিতে দেশের বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। তবে ইসরায়েলের কঠোর অবরোধ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আহত শিশুদের ক্ষতগুলোতে ইনফেকশন ও নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের অঙ্গহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, কয়েক মাস ধরে চলা বোমাবর্ষণ ও অবরোধের কারণে গাজার চিকিৎসাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালগুলো ওষুধ, জ্বালানি, কর্মী এবং যন্ত্রপাতির তীব্র সংকটে ভুগছে।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরে ইউনিসেফের মুখপাত্র বলেন, গাজার শিশুদের দৈনিক জীবনে ভয় ও সহিংসতা এতটাই জেঁকে বসেছে যে, ট্রমা বা মানসিক আঘাত এখন আর তাদের জীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি তাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেবল গাজা নয়, লেবাননেও শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ সংঘাত বৃদ্ধির পর থেকে লেবাননে এ পর্যন্ত ২৪৭টি শিশু নিহত এবং ৯৯২টি আহত হয়েছে।
এদিকে, গাজার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’ জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গাজায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৭৩ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে, গত ১১ অক্টোবর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই অন্তত ১ হাজার ৭ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া উদ্ধারকারী দলগুলো ইতিপূর্বে অবরুদ্ধ থাকা বিভিন্ন এলাকা থেকে ৭৮৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।