ইয়েমেনের হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় শহর আল-মাখার (মোখা) নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। গোষ্ঠীটি এখন কৌশলগত বাব এল-মান্দেব প্রণালির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেন সরকারের তিনটি অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মোখা দখলের ফলে ইয়েমেনের লোহিত সাগর অঞ্চলের প্রায় পুরো উপকূলই এখন একপ্রকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে এল।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুতিরা প্রণালির সরাসরি কাছাকাছি অবস্থিত আরও কয়েকটি উপকূলীয় শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তারা পুরো ইয়েমেনের লোহিত সাগরীয় উপকূল দখলের চেষ্টা করছে।
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনজুড়ে লড়াই তীব্র হয়েছে। এই সংঘাত দেশের সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হুতিরা তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং এতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেছেন, লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর আল-মাখা (মোখা) হুতি যোদ্ধারা দখল করেছে বলে যে খবর এসেছে, তা সত্য হলে এটি হবে বড় ধরনের একটি ঘটনা।
তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘তারা সরকারি বাহিনীর চেয়েও আরও বেশি এগিয়ে যাচ্ছে।’ তাঁর মতে, ইয়েমেনের বিদ্রোহীরা যদি তাইজ ও আল-মাখার মধ্যকার সড়ক বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তাহলে তা সরকারের জন্য ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আঘাত’ হবে।
পুস্তাই বলেন, ‘তারা যদি মোখা দখল করে নেয়, তাহলে লোহিত সাগরে ইয়েমেনের প্রায় পুরো উপকূলই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর অর্থ হলো, বাব এল-মান্দেবে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য আরও সহজ হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালির প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল), যেখানে বাব এল-মান্দেবে প্রণালি অনেক সরু, এর প্রস্থ প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল)।
পুস্তাই বলেন, ‘এর অর্থ হলো, তারা শুধু কামান দিয়েই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। জাহাজে হামলার জন্য তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনও ব্যবহার করতে হবে না। এটি সৌদি আরবের নৌপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য অবশ্যই বড় ধরনের আঘাত হবে।’
এদিকে ইয়েমেনে হুতিরা জানিয়েছে, হাজ্জাহ গভর্নরেটের আকাশসীমায় অভিযান চালানো সৌদি আরবের একটি ‘কারিয়াল’ সশস্ত্র গোয়েন্দা ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে বলেন, ‘উপযুক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে’ ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা গত সপ্তাহে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় আকারের অভিযান শুরু করে। তারা সৌদি ভূখণ্ডেও হামলা চালিয়েছে, যাতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে।
উলফগ্যাং পুস্তাই বলেছেন, হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে তেহরানের ওপর চাপ বাড়লেও মাটির পরিস্থিতিতে এর খুব বেশি পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ হুতিরা নিজেদের যুদ্ধ নিজেরাই লড়ছে এবং তারা ইতোমধ্যে বাইরের সরবরাহ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। পুস্তাই বলেন, ‘হুতিদের ওপর ইরানের বিশাল প্রভাব রয়েছে। কিন্তু হুতিরা শুধু ইরানের প্রক্সি নয়। তারা নিজেদের যুদ্ধও লড়ছে।’
খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সতর্ক করেছে। পাকিস্তান আরও বলেছে, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে, যদি সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকে। পুস্তাই বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ চাপ ‘তেহরানের নেতাদের ওপর অবশ্যই প্রভাব ফেলবে’, তবে এর বাস্তব প্রভাব ‘বরং সীমিত’ হবে।
তিনি বলেন, হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ‘ইতোমধ্যেই বাইরের সহায়তা থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।’ গত কয়েক দশকে হুতিরা দেখিয়েছে যে, তাদের হাতে বর্তমানে যে অস্ত্র রয়েছে, তা দিয়েই তারা লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। পুস্তাই আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত হুতিদের নিজেদের ইচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে তাইজের পশ্চিমে হুতিরা একটি বড় ধরনের জয় পেয়েছে। গত নয় দিন ধরে সেখানে তীব্র লড়াই চলছে। জানা গিয়েছিল, হুতিরা তাইজের পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ তাদের মূল লক্ষ্য, প্রধান অর্জন হিসেবে তারা আল-মাখা শহর এবং লোহিত সাগরের উপকূল দখল করতে চেয়েছিল।
আল-মাখা দখল হুতিদের বাব এল-মান্দেবে দিয়ে জাহাজ চলাচল ঠেকানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ সুবিধা দেবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর জন্য প্রধান তিনটি সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করার সক্ষমতাও তারা পাবে। ওই তিনটি সরবরাহ পথ হুতিরা ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দখল করেছে। এখন হুতিরা আল-মাখা শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দেবে, সেটি কেবল সময়ের ব্যাপার।
মাঠপর্যায়ের কয়েকজন সূত্রের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, শহরটি হুতিদের দখলে চলে গেছে। সরকারি বাহিনী আল-মাখা থেকে তাদের সব সামরিক ডিভিশন পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম তাইজে এটি হুতিদের একটি নির্ণায়ক জয় বলেই মনে হচ্ছে।