ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবার দেশের ভেতরে ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে দেশের স্থল সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের কথাও জানিয়েছে তারা। বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলাকালে এ ধরনের খবর বেশি প্রকাশ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরানি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধটিকে জাতীয় নিরাপত্তার লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে এবং বিদেশে থাকা বিভিন্ন পক্ষকে তারা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধক্ষমতার বার্তাও দিতে চেয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায়, আট সদস্যের একটি নেটওয়ার্কের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, নেটওয়ার্কটি ‘বিপ্লববিরোধী’ এবং ‘রাজতন্ত্রপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি অভিযোগ করেছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তিরা জানুয়ারিতে দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভের সময় মলোটভ ককটেল ব্যবহার এবং টায়ার জ্বালানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতারাও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও বিক্ষোভের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে।
ইরানে জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ইরানি দেশের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে এই রাজতন্ত্রের পতন হয়েছিল। ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিদেশে থাকা ছেলে রেজা পাহলভি দেশটির সরকারের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা। জানুয়ারিতে তিনি ইরানিদের দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই অস্থিরতার সময় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে ইরানের ভেতরে পাহলভির সমর্থনে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা থাকলেও বর্তমানে দেশটির ভেতরে বড় কোনো সংগঠিত রাজতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় নেই। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে একাধিকবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ হলেও সেগুলোর মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদ। রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ছিল না এসব আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি।
যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন। যুদ্ধটি শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। ইরানের বাইরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভগুলোতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জায়গায় রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি বিশেষভাবে জোরালো ছিল।
এরপর ইরান সরকার রাজতন্ত্রের সমর্থক বলে দাবি করা বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে। এর মধ্যে দেশের ২৬টি প্রদেশে তথাকথিত ১১১টি ‘রাজতন্ত্রপন্থী সেল’ গ্রেপ্তারের কথা রয়েছে। ১৮ মার্চ গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়।
ইরানের কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির বিক্ষোভকে ‘অভ্যুত্থান’চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সশস্ত্র এজেন্টরা এই বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছিল এবং তাদের মধ্যে রাজতন্ত্রপন্থীরাও ছিল। বিক্ষোভ দমনের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ‘নিষ্ঠুরতার’ নিন্দা করেছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিচার বিভাগ কয়েক ডজন বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তাদের মধ্যে জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজনও রয়েছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিল্পী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যেসব কর্মকাণ্ডকে জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বলে মনে করেছে, তাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এসব গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানের পশ্চিম সীমান্তের কাছে, ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় কুর্দি যোদ্ধারাই দেশটির সবচেয়ে বড় অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র হুমকি। ইরানি কর্তৃপক্ষ যেসব গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাদের বেশ কয়েকটি বহু বছর ধরে উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে আছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সামরিক বাহিনী ইরাকে এসব গোষ্ঠীর পরিচালিত ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরাক সরকারের সঙ্গেও নিরাপত্তা চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। চলতি বছরের যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনায় ছিল, কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পশ্চিম ইরানে সীমিত স্থল অভিযান চালাবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজের ব্যাপক বিমান হামলার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স মার্চের শুরুতে জানিয়েছিল, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি বা পিজেএকে, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান বা পিডিকেআই এবং কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি বা পিএকে-সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ইরানি কুর্দি যোদ্ধা সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন।
তবে এসব গোষ্ঠী জানিয়েছিল, তাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র ছিল না। একই সঙ্গে অভিযান শুরু করার জন্য ওয়াশিংটনের কাছ থেকেও তারা স্পষ্ট কোনো সংকেত পায়নি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি। এপ্রিলের মধ্যে আইআরজিসি সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে আরও সেনা পাঠায়। পরে ট্রাম্প বারবার দাবি করেন, তিনি কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। তবে তারা সেই অস্ত্র নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কুর্দি বাহিনীর বাইরে ইরানের বঞ্চিত ও অস্থির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাতেও বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচ যোদ্ধারা সক্রিয় রয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, তারা বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জইশ আল-আদলের একটি সেল ভেঙে দিয়েছে।
ওই অভিযানে একজন বিদ্রোহী যোদ্ধা নিহত এবং ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানানো হয়। এ সময় রাইফেল, গ্রেনেড লঞ্চার এবং বিস্ফোরকও জব্দ করা হয়েছে। তবে গোষ্ঠীটির বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলায় কখনও কখনও পুলিশ কর্মকর্তা এবং আইআরজিসির সদস্যরা নিহত হয়েছেন।
ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ও অনুপ্রবেশের ঝুঁকি কমাতে তারা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, কুর্দি ও বেলুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বাইরের দেশগুলোর সমর্থন বাড়লে ইরানি কর্তৃপক্ষের জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আরও বড় হতে পারে।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে ইরানি রাষ্ট্র এবার জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বাইরের সমর্থনের যেকোনো লক্ষণকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।’ ভাতাঙ্কা আরও বলেন, ‘আমি কেবল তখনই জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যুদ্ধে) সম্ভাব্যভাবে নির্ধারক শক্তি হিসেবে দেখছি, যখন তারা তেহরানের শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য বৃহত্তর কোনো বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রচেষ্টার অংশ হবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইতোমধ্যেই এমন কিছুর আশঙ্কা করছে এবং একে বিদেশি নেতৃত্বাধীন ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ অভিযান বলে অভিহিত করছে।’
অন্যদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসি বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াগুলো ইরান সরকারের জন্য অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আরও তীব্র হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি, উদাহরণ হিসেবে, স্থলবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এসব গোষ্ঠী ‘তেহরানের জন্য ভয়াবহ সমস্যার কারণ হতে পারে।’
পারসি আরও বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প যদি এমন সামরিক ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেগুলো তিনি এর আগে এড়িয়ে গেছেন, যেমন স্থলবাহিনী মোতায়েন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশের ভেতরে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ব্যবহার করতে চাইবে, এমনটা ধারণা করা পুরোপুরি সম্ভব।’
জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মকর্তারা ইরানি বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া উচিত।
যুদ্ধ শুরুর পরও ওয়াশিংটন থেকে একই ধরনের বক্তব্য শোনা গেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ থেকে তৈরি চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরে একটি গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিতে পারে। এমনকি এর ফলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনও হতে পারে বলে তিনি আলোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এই চাপ ইরানিদের আবার রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করতে পারে। এমনকি এর ফলে আইআরজিসির ভেতরেও বিভাজন তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘হয়তো জনগণ রুখে দাঁড়াবে। মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশ, মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সামরিক বাহিনী বেতন পাচ্ছে না, (এবং) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর গত সপ্তাহে আতঙ্কিত অবস্থায় ছিলেন।’