ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের একটি প্রতিনিধি দল মিসরের রাজধানী কায়রোতে পৌঁছেছে গতকাল মঙ্গলবার। সেখানে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা হবে। এই আলোচনায় মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিনিধি দলটি মিসরের কর্মকর্তাদের এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করবে। আলোচনায় অংশ নেওয়া হামাসের দুটি সূত্র এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর দুই কর্মকর্তা লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আশারক আল-আওসাতকে জানিয়েছেন, হামাস সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুটি বিষয়ে নতুন ভাষা বা নতুন প্রস্তাব তৈরি করেছে। একটি হলো—বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর হাতে থাকা অস্ত্রের ভবিষ্যৎ, আর অন্যটি হলো গাজায় হামাস সরকারের কর্মচারীদের অবস্থান।
হামাসের সূত্রগুলো জানায়, সংগঠনটি চুক্তির পঞ্চম ধারা (Clause Five) নিয়ে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দেবে। এই ধারাটি সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি আইনি কমিটি এই বিষয়টি সমাধান করবে এবং একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি আইনের অধীনে কর্মচারীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখবে।
তারা আরও জানায়, অস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তির অষ্টম ধারায় এবার ‘অবকাঠামো (infrastructure) ’ শব্দটি যোগ করা হবে। আগে হামাস এই শব্দটি গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। তবে এই শব্দের অর্থ ও এর আওতায় কী থাকবে, তা কায়রোর বৈঠকে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। হামাসের সূত্রগুলো বলেছে, এই দুটি ধারা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যে সমঝোতা হবে, হামাস তা মেনে নেবে।
তারা আরও জানায়, হামাসের আলোচনাকারী দলকে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় এগিয়ে যাওয়ার পূর্ণ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে শর্ত হলো, প্রথম ধাপের বাকি সব শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফিলিস্তিনের আরেকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এক সূত্র জানিয়েছে, এই আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে। মধ্যস্থতাকারী এবং অন্য পক্ষগুলোর প্রস্তাবের প্রতি হামাস আগের তুলনায় এবার আরও ইতিবাচকভাবে সাড়া দিতে পারে। ওই সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তুরস্কে হওয়া বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে হামাস অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে জানিয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রসংক্রান্ত ধারা নিয়ে সেখানে উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়েছে।
চতুর্থ একটি সূত্র জানায়, হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন উপলক্ষে ইস্তাম্বুলে অবস্থানরত হামাস নেতাদের ওপর তুরস্ক জোরালো চাপ দিয়েছে, যাতে তারা ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সূত্রটি আরও জানায়, ইসরায়েল যখন স্থল অভিযান আরও জোরদার করছে এবং নতুন নতুন এলাকা দখল করছে, তখন তুরস্ক হামাসকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে ফিলিস্তিনিদের উন্নত জীবনযাপন, পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তবে হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা অতিরিক্ত আশাবাদী না হওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, হামাসের ভেতরে এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত এবং ইসরায়েলকে যেন চুক্তি আটকে দেওয়ার কোনো অজুহাত না দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও ইসরায়েল হামাসের নতুন প্রস্তাব বা পরে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে হওয়া যেকোনো সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মধ্যস্থতাকারীসহ সব পক্ষই জানে যে, সামনে ইসরায়েলের নির্বাচন থাকায় তারা যেকোনো প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তবুও হামাস তাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন করে ‘অবকাঠামো’ শব্দটি যুক্ত করতে রাজি হয়েছে। পাশাপাশি তারা অস্ত্রগুলোকে মধ্যস্থতাকারীদের, বোর্ড অব পিস এবং গাজা শাসন কমিটির পূর্ণ তদারকির আওতায় আনতেও প্রস্তুত। এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রধান দায়িত্ব থাকবে গাজা প্রশাসন কমিটির ওপর।
এই আলোচনা এমন সময় হচ্ছে, যখন ইসরায়েল বোর্ড অব পিস এবং তাদের আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীকে (আইএসএফ) গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। তাদের কার্যক্রম শুরু হবে রাফাহ থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাফাহে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে প্রথম অস্থায়ী আবাসন ইউনিট নির্মাণ করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো, একটি নির্ধারিত ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়নের বিনিময়ে ভবিষ্যতে হামাসকে ধীরে ধীরে নিরস্ত্র হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা।
বোর্ড অব পিস জোর দিয়ে বলেছে, এই রোডম্যাপ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মিলে এটি তৈরি করা হয়েছিল এবং গত এপ্রিল মাসে হামাসের কাছে উপস্থাপন করা হয়। এরপর সব পক্ষ কয়েক দফা এই রোডম্যাপে পরিবর্তন আনলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত কিংবা গাজার জন্য বোর্ড অব পিসের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভের আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজায় প্রবেশসংক্রান্ত বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে হামাস এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা এই মুহূর্তে হামাসকে কোনো মন্তব্য না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের আশা, হামাস নীরব থাকলে আলোচনা এগোবে, একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে এবং সেই সমঝোতা মেনে চলতে ইসরায়েলকে বাধ্য করা সম্ভব হবে।