লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আকস্মিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়া আবারও গতি পেয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য সংঘাত থামানো এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসহ অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়ের স্থায়ী সমাধানের জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ালে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁর নির্ধারিত সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করেছিলেন।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যোগ দেবেন, যিনি ইতিমধ্যেই সেখানে অবস্থান করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও আজ শনিবার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছাবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে মার্কিন হোয়াইট হাউস উইটকফের এই সফর নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুক্রবার (১৯ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে লেবাননে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র এবং ইসরায়েলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ইসরায়েলের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘হিজবুল্লাহ যদি আমাদের ওপর হামলা না করে, তবে আমাদের জন্যও এটি যুদ্ধের সময় নয়।’ তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমান অবস্থানেই থাকবে।
লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রথম এক ঘণ্টায় ইসরায়েল অন্তত এক ডজন বিমান হামলা চালালেও বিকেল ৫টার পর থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া তীব্র ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে অন্তত ৪৭ জন নিহত এবং ৯৭ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলার মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইরান ও লেবাননে অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছিল।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য গতকাল শুক্রবার কিছুটা বাড়লেও সাপ্তাহিক হিসেবে তা প্রায় ৮ ডলার কমেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
ইরানের হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন তারা পূর্বনির্ধারিত সব ট্রানজিট ফি মওকুফ করবে।
চুক্তির শর্ত ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানকে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বড় ধরনের রেহাই দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের অবরুদ্ধ থাকা শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে শিথিল করা। এছাড়া ইরানের পুনর্গঠনের জন্য একটি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাবও রয়েছে এই চুক্তিতে।
তবে ওয়াশিংটনে এই চুক্তিটি তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়ে ট্রাম্প ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেসের খোদ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা।
সমালোচনার জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো সাফাই গেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই যুদ্ধ ইরানকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দিয়েছে! আমরা কোনো হতাশা থেকে আলোচনায় বসিনি, ইরান বসেছে। ওরা একদম শেষ! আমরা এই ৬০ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। এই সময়ে ওরা কোনো নগদ অর্থ পাচ্ছে না, একটি সেন্টও নয়!’
ইসরায়েল-লেবানন কূটনৈতিক পদক্ষেপ
গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে উসকানিমূলক হামলা শুরু করলে লেবানন এই আঞ্চলিক যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার হয়ে পড়ে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানালেও বলেছেন, এই উত্তেজনা একটি সমন্বিত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারবে না।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। রুবিও হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে একটি সার্বভৌম লেবানন রাষ্ট্রের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আগামী ২৩ থেকে ২৫ জুন ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে পরবর্তী দফার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।