ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মুখে তাঁর ডানপন্থী জোট। ফলে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলোও এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি প্রায় ২৬টি আসন পেতে যাচ্ছে। আর সব মিলিয়ে তাঁর ডানপন্থী জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৫৩ টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে নির্বাচনে নেতানিয়াহু জয়ী হননি, আবার এখনই তাঁকে পরাজিত বলারও সুযোগ নেই।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের দল ২১টি আসন পেয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিরোধী জোটের দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা প্রায় ৪৮। সরকার গঠনের জন্য তাদের আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে।
ইসরায়েলের দুই আরব দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির আরব বা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে অপরাধ পরিস্থিতি, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ, বর্ণবাদী আচরণ এবং গাজায় যুদ্ধের প্রভাব কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ইসলামপন্থী দল রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস ২০২১ সালের নির্বাচনের পর প্রথম আরব রাজনীতিক হিসেবে ইসরায়েলের সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টে রয়েছে কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী ধারার কয়েকটি দল।
বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোকে বিরোধী জোটের অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আইজেনকটের দুই ডানপন্থী মিত্র নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। জয়েন্ট লিস্ট অবশ্য নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে রাজনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তুত থাকার কথাও জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, আরব ও বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য সহযোগিতা ঠেকানোই এখন তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা সংকটকে কাজে লাগাতে পারেন। এমনকি ইরানে নতুন সামরিক অভিযান চালানো বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বুধবার আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ তোলে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি অভিযোগটি পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। তবে নির্বাচনের দিন বিভিন্ন দলের করা হাজার হাজার অভিযোগ এরই মধ্যে খারিজ করা হয়েছে।
আইজেনকট নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পরিবর্তনের পক্ষে জনমত তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি নেতানিয়াহুকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
সেনাসদস্য, বন্দী, হাসপাতালে থাকা ব্যক্তি, বিদেশে কর্মরত কূটনীতিক ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের দ্বৈত খামের ব্যালট গণনা বাকি থাকায় চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। এসব ব্যালটের সংখ্যা আনুমানিক ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার, যা ১০ টির বেশি আসনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচিত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এমন একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যাঁর ৬১ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রার্থী ২৮ দিনের মধ্যে সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন; প্রয়োজনে সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। ব্যর্থ হলে অন্য প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সমাধান না হলে নতুন নির্বাচন হতে পারে।
বিরোধীরা সরকার গঠন করতে না পারলেও পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অচলাবস্থা নিরসনে হারজগ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বানও জানিয়েছেন।