ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে আশার সঞ্চার করেছিল। ভাবা হয়েছিল, পাকিস্তানে এই আলোচনা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে আরও জোরালো করবে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে। যদিও তা ঘটেনি, তবে আলোচনায় বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং তা অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ পরিবেশে।
আলোচনায় অংশ নিতে বেশ পরিশ্রম করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে যুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে সন্দিহান এবং প্রভাবশালী এই ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় তিনি আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। এরপর রোববার সকালে যখন তিনি বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁর চোখেমুখে ছিল ঘুমের অভাবের ছাপ আর ঝুলিতে ছিল না কোনো চূড়ান্ত চুক্তি। সামনে পড়ে ছিল দেশের উদ্দেশে আবার সেই দীর্ঘ পথ।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতিতে আলোচনার সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অন্য একটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। সেটি হলো, এমন একটি দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, যাদের সঙ্গে সমঝোতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা বরাবরই কঠিন। কিছু কর্মকর্তার মতে, এর ফলে ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্তারা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে—ইরান হয়তো শেষ পর্যন্ত এই প্রাণঘাতী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ বন্ধ করতে তাদের শর্তগুলো মেনে নেবে।
আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘সবাইকে শুভ সকাল।’ মধ্যস্থতা করা এবং ‘অসাধারণ আতিথেয়তা’ প্রদর্শনের জন্য পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় যা কিছু অপূর্ণতা থেকে গেছে’, তার জন্য পাকিস্তান কোনোভাবেই দায়ী নন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা করেছি এবং ইরানিদের সঙ্গে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হয়েছে। এটা একটা ভালো খবর। তবে খারাপ খবর হলো, আমরা এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি।’
১৪ মাস আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল অ্যাসাইনমেন্ট। অথচ যখন তিনি এই ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন শনিবার রাতে মায়ামিতে এক ইউএফসি লড়াইয়ের আসরে ট্রাম্পকে সময় কাটাতে দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ট্রাম্প যে ছয় সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তা থামানোর দায়িত্ব দিয়ে তিনি ভ্যান্সকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে ভ্যান্স আড়াই দিন যাতায়াত এবং আলোচনায় ব্যয় করেছেন। বিগত বহু বছরের মধ্যে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘতম সরাসরি বৈঠক। এর আগে উইটকফ এবং কুশনারের নেতৃত্বে হওয়া আলোচনাগুলো ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতায় ইরানের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে বা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
আলোচনার বিষয়ে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভ্যান্স আলোচনায় বসার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থাকা পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। ওই কর্মকর্তা জানান, ভ্যান্স এবং ইরানি আলোচকদের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং তারা একে অপরের প্রতি নমনীয় হয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত বলে মনে হচ্ছে।
ফক্স নিউজের সানডে মর্নিং ফিউচারস অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আলোচনা ছিল অত্যন্ত নিবিড় এবং শেষের দিকে পরিবেশ বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আমাদের যা যা পয়েন্ট দরকার ছিল তার প্রায় সবগুলোতেই আমরা পৌঁছেছিলাম, শুধু একটি বিষয় ছাড়া—তারা তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি হয়নি।’
মার্কিন ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আলোচনা শুরু হওয়ার পর মার্কিন দলের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে যায়, ট্রাম্প প্রশাসন কেন ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়ার বিষয়ে এত কঠোর, সেই গভীরতা ইরানিরা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি।
ইরান কয়েক দশক ধরে দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা করছে না। তবে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ তাঁর মিত্ররা দাবি করেছেন, এই প্রতিশ্রুতির কোনো ভিত্তি নেই। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই অনড় যে, ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে, যা বেসামরিক কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। ইরান এত দূর যেতে রাজি হয়নি এবং তারা সম্ভবত আশা করেছিল যে ট্রাম্প হয়তো কিছুটা নমনীয় শর্তে রাজি হবেন।
ভ্যান্স পুরো আলোচনাকালে সেই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করেছেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান। পাশাপাশি তিনি এটিও বোঝার চেষ্টা করেছেন যে, ইরান আসলে তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কী ভাবছে। ভ্যান্সের ধারণা হয়েছে, যুদ্ধের মাঠের বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় ইরান নিজেদের অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ভাবছে, যা আসলে যুক্তিযুক্ত নয়। ওই কর্মকর্তা ইরানিদের বক্তব্যের বিস্তারিত না জানালেও এটুকু বলেছেন যে, ইরানের দুর্বলতাগুলো এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে আরও পরিষ্কার এবং তারা এখন সেগুলো পরখ করে দেখার পরিকল্পনা করছে।
এদিকে, গতকাল রোববার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন—তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করবেন। এই পদক্ষেপ মাত্র ছয় দিন আগে পৌঁছানো সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতিকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। এই সিদ্ধান্তে অন্তত স্বল্প মেয়াদে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, এটি ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করবে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মার্কিন দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—ইরানকে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং তাদের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে নিতে দিতে হবে; প্রধান সব পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে; আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর উত্তেজনা প্রশমন কাঠামো মেনে নিতে হবে; হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে এবং কোনো শুল্ক ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে চলাচলের জন্য খুলে দিতে হবে।
রোববার রাতভর আলোচনার করার পর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এমন কোনো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারিনি যেখানে ইরানিরা আমাদের শর্তগুলো মেনে নিতে রাজি ছিল। আমার মনে হয় আমরা যথেষ্ট নমনীয় ছিলাম।’ সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষ করেই ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেষ প্রস্তাবের ভিত্তিতে এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে অস্বীকার করে বলেন, ‘দেখা যাক ইরানিরা এটি গ্রহণ করে কি না।’
কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যে ইরান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো মেনে নেবে। ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে রাজি না হয়, তবে তিনি দেশটির অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভবিষ্যদ্বাণী হলো, তারা ফিরে আসবে এবং আমরা যা যা চাই তার সবই তারা আমাদের দেবে।’
রুদ্ধদ্বার আলোচনার বিষয়ে অবহিত এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইসলামাবাদের আলোচনা রোববার ভোরে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাতে নানা উত্থান-পতন দেখা দিয়েছিল। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভ্যান্স কোনো রকম ‘পরবর্তী সম্ভাব্য আলোচনার’ পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ ত্যাগ করেছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভ্যান্স পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, যারা এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন। হোয়াইট হাউসের দুজন কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তানি দল এই বৈঠকের জন্য ভ্যান্সকে প্রধান ভূমিকায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করেছিল এবং পরবর্তীকালে ট্রাম্প ভ্যান্সকে আলোচনার নেতৃত্ব দিতে বলেন।
যুদ্ধের কোনো শেষ না দেখা যাওয়ায় এবং যুদ্ধবিরতি আদৌ টিকবে কি না সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে, ট্রাম্প ও ভ্যান্সকে দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান দাম মেনে নিতে হবে—এমন একটি প্রবণতা যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাদের জনপ্রিয়তাকে আরও কমিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে যুদ্ধের কারণে গ্যাসের দাম অন্তত সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নভেম্বরের আগে তা নাটকীয়ভাবে কমবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।
তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট