যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করতে সম্মত হয়েছে ইরান। তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ও পৃথকভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী এসব তথ্য জানিয়েছেন।
আরাঘচি বলেন, ইরান শুরুতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। ওই পরিকল্পনায় প্রণালি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়। পরে কাতারের পক্ষ থেকে সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন বা তারও কম করার অনুরোধ জানানো হয়। গতকাল কাতারের প্রতিনিধিদলের ইরান সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা কমিয়ে দুই দিন নির্ধারণের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে একগুচ্ছ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয় দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সেখানে নৌ-চলাচল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও ওমানের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত নতুন নৌ-চলাচল পথটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চায় তেহরান। একই সঙ্গে অন্য সব নৌপথ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে দেশটি। ইরানের শর্ত অনুযায়ী প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, শান্তি আলোচনা শুরু এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরেই এসব শর্ত তেহরানের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সে সময় তিনি শর্তগুলোর কয়েকটি প্রকাশ করেছিলেন। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জুলাই মাসে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমাতে হবে।
ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে জুন মাসে ইরানকে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তা পুনর্বহাল করতে হবে।
কাতারে রাখা অর্থসহ বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সব তহবিল ও অর্থ ছাড় করে দিতে হবে।
ইরান ও ওমানের নির্ধারণ করা হরমুজ প্রণালির নতুন নৌ-চলাচল পথ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং অন্য সব নৌপথ বন্ধ করতে হবে।
সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে হবে।
যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সংশ্লিষ্ট সব রণাঙ্গনে সংঘাত বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে।
এদিকে, গত সেপ্টেম্বরে রেজায়ী আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। বিশেষ করে ইরানের বিপ্লববিরোধীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার অবসান দাবি করেছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য ইরানের সামরিক প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেছেন আরাঘচি। তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন যুদ্ধের জন্য বেশি প্রস্তুত। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।
আরাঘচির ভাষায়, যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র আগের যুদ্ধগুলোর মতো এবারও তাদের কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। বরং ওয়াশিংটনের আগের পরাজয়ের তালিকায় আরও একটি পরাজয় যুক্ত হবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন।
ইরানের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিও স্বীকার করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। আরাঘচি বলেন, অর্থনৈতিক চাপের কাছে ইরান তার মর্যাদা বিকিয়ে দেবে না কিংবা স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না। নিজেদের শক্তিতে এসব সমস্যা মোকাবিলা করে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি নিয়েও কথা বলেছেন আরাঘচি। তাঁর দাবি, চিঠিটির উদ্দেশ্য হলো আলোচনা অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত মতপার্থক্যগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো। তিনি বলেন, আলোচনার পথ পুরোপুরি খোলা রাখার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে চিঠিটি যদি সংঘাত উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ভুলের তালিকায় আরও একটি ভুল।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সময়সীমা কমিয়ে দুই দিনের পরিকল্পনায় পৌঁছালেও ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। তেহরানের দাবি, এসব শর্ত পূরণ এবং প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার মধ্য দিয়েই ওয়াশিংটনের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।