ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখন ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কয়েক মাসের সংঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় দেশটির অর্থনীতি আরও সংকটে পড়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ জানিয়েছে, ইরানে কোনো কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত এক বছরে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পশ্চিম ইরানের ৩৩ বছর বয়সী ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী নিমা বলেন, তিনি এখন ‘সারভাইভাল মোডে’ আছেন। বিদেশি মুদ্রায় আয় করায় একসময় তিনি মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কিছুটা সামলাতে পারতেন। কিন্তু এখন বাজার-সদাইয়ের পেছনেই আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে নতুন ফোন কেনা, বাইরে খাওয়া কিংবা বই কেনার মতো বিষয়গুলোও তাঁর কাছে বিলাসিতা হয়ে গেছে।
রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী—গত এক বছরে রান্নার তেলের দাম প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে ৮১০ গ্রাম রান্নার তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ৭৮ ডলারের সমান মূল্যে। এক কেজি মাংসের দাম উঠেছে ১৫ ডলার পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৮০ শতাংশের বেশি বার্ষিক মূল্যস্ফীতি। সংঘাত শুরুর পর দেশটির কর্মসংস্থানেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ইরানি সংবাদপত্র ‘দুনিয়া-ই একতেসাদ’-এর হিসাবে, জুনের শুরুতে দেশটিতে বেকারত্ব বেড়ে চার বছরের সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে; এর আগের প্রান্তিকে ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্থানীয় মুদ্রায় আয় করা মানুষের অবস্থা আরও সংকটপূর্ণ। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে কাজ করা ৩৮ বছর বয়সী রেজা বলেন, রিয়ালে আয় করলেও বাস্তবে তাদের খরচ যেন ডলারে হিসাব হয়। ইরানি রিয়ালের দরও ব্যাপকভাবে কমেছে। সংঘাত শুরুর আগে এক ডলারের বিপরীতে যেখানে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল পাওয়া যেত, এখন তা প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজারে উঠে গেছে।
রেজা জানান, অনেক বন্ধু ও সহকর্মী সংসার চালাতে অন্তত দুটি চাকরি করছেন। তাঁর বড় ভাই দিনের বেলা গুদামে কাজ করেন, সন্ধ্যার পর মধ্যরাত পর্যন্ত রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। চার সদস্যের পরিবারের খাবার ও বাড়িভাড়া জোগাতেই এই অতিরিক্ত শ্রম।
চিকিৎসার খরচও অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তেহরানের ২৭ বছর বয়সী চিকিৎসাকর্মী সামিরা জানান, কেউ কেউ ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বদলে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দক্ষিণ ইরানের ৩২ বছর বয়সী কামরান দেশ ছাড়তে চান। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার মতো অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না। অনলাইন গেম ‘ওয়ার্ল্ড অব ওয়াক্র্যাফট’-এ ভার্চুয়াল মুদ্রা সংগ্রহ ও বিক্রি করে তিনি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কিছুটা বেশি আয় করেন। তবু রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে না পেরে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হয়েছে।
উত্তর ইরানে থাকা ফ্রিল্যান্স প্রযুক্তিকর্মী মাজিদও গাড়ি ধোয়া বা ট্যাক্সি চালানোর মতো নানা খণ্ডকালীন কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁর মতে, প্রতিদিন পরিবারকে খাওয়াতে পারবেন কি না—এই দুশ্চিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকা কোনো জীবন নয়।
ইরানজুড়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া অনেকেরই ধারণা, অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। তাঁদের কাছে বিদেশে পাড়ি জমানো আকর্ষণীয় সমাধান হলেও, সেই পথও অধিকাংশের জন্য আর্থিকভাবে নাগালের বাইরে। ফলে কাজ করেও যখন সঞ্চয়, নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মিলছে না, তখন অনেকের মুখেই উঠছে একই প্রশ্ন—‘আর কাজ করে কী লাভ?’