হরমুজ প্রণালি ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে নতুন প্রযুক্তির ‘ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটনের অভিযানের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌযান ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই জোড়ালো পাল্টা হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। তবে পেন্টাগন জানিয়েছে, মার্কিন নৌযান ও জর্ডানের ঘাঁটিতে ছোঁড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই সফলভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস বা প্রতিহত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থানরত অন্তত ১০টি মার্কিন রণতরী এবং জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একযোগে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এ হামলায় ইরান প্রথমবারের মতো তাদের উন্নত ‘ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সিকার’ বা আলোক-সংবেদী প্রযুক্তি চালিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। জিপিএস সংযোগ ছাড়াই কেবল ক্যামেরা ও বিশেষ লাইট সেন্সর ব্যবহার করে নির্দিষ্ট নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আঘাত হানতে সক্ষম এই প্রযুক্তি, যা জ্যামিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা তুলনামূলক কঠিন। এই হামলায় অন্তত ৯টি যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সচিব মহসেন রেজাই জানান, তাদের নতুন ‘বিশেষ ডেস্ট্রয়ার-বিরোধী’ ক্ষেপণাস্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এই হামলায়। তবে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের বহুল আলোচিত মাঝারি পাল্লার ‘কাসেম বাসির’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নাকি অন্য কোনো নতুন সংস্করণ—তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে পর্যালোচনা চলছে।
ইরানের সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, খার্গ দ্বীপের তেল হাবের কাছে পাঁচটিতে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, ইরানি তেল ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে এবং আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার হিসেবে জর্ডানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও একাধিক মার্কিন নৌযানে এই আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আইআরজিসি সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থানরত সামুদ্রিক ট্যাংকার ও ঘাঁটিতেও সম্ভাব্য হামলা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট নৌযানের ক্রু ও কর্মীদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
ইরানের এই আগ্রাসী অবস্থান এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের ২০ শতাংশ পরিবহন হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
হামলা ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় গত জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সরাসরি ও ধারাবাহিক পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে একটি বৃহৎ আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।