আমেরিকা যদি আবারও হামলা শুরু করে, তবে তার জবাবে মার্কিন অবস্থানে ‘দীর্ঘমেয়াদি ও যন্ত্রণাদায়ক’ পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইরানের এই কড়া বার্তার ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মার্কিন পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছে। বর্তমানে ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও, হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহকারী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলারেও পৌঁছে যায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা
বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটিকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং গ্রহণ করবেন। এমনকি হরমুজ প্রণালি দখল করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এটি উন্মুক্ত করার একটি পরিকল্পনাও ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থল সৈন্য ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইরানের কঠোর অবস্থান
এদিকে মার্কিন তৎপরতার মধ্যে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার মাজিদ মৌসাভি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি আপনাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর কী অবস্থা হয়েছে। এখন আপনাদের যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হবে।’
ইরান ইতিমধ্যে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এমনকি ‘আমাজন’ (Amazon) জানিয়েছে, বাহরাইন ও আরব আমিরাতে তাদের ক্লাউড সার্ভিস অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও মতভেদ
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ (MFC) নামে একটি নতুন জোট গঠনের চেষ্টা করছে। তবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী নয়। এদিকে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার চেষ্টা চললেও তা থমকে আছে। ইরান চায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে, কিন্তু ট্রাম্পের দাবি—আলোচনার শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যু সমাধান করতে হবে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ ইরানকে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে বলেছেন। অন্যদিকে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জাপানি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
সব মিলিয়ে, একদিকে যুদ্ধের দামামা আর অন্যদিকে তেলের বাজারের অস্থিরতা বিশ্ববাসীকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই জলপথের ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে শান্তি না কি এক মহাযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।