হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইয়েমেনের লোহিত সাগরীয় উপকূল-জুড়ে প্রায় পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা। ইরানপন্থী হুতি বাহিনীর যোদ্ধারা গতকাল শুক্রবার বাব আল-মান্দেব প্রণালির পেরিম দ্বীপ দখল করে। লোহিত সাগরের বন্দরগুলো থেকে সংকীর্ণ এ প্রণালী দিয়েই সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি করা হয়ে থাকে।

হুতিদের এই তৎপরতার মাধ্যমে হরমুজের পর বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা বৃদ্ধির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। যদিও হুতিদের দাবি, কেবল সৌদি আরব ছাড়া বাব আল-মান্দেব সবার জন্য উন্মুক্ত। সৌদি আরব ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে একটি জোট তৈরি করে কয়েক বছর ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে।

বৈশ্বিক নৌ পরিবহনের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালি, সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দেব। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির ২৭ শতাংশ ও এলএনজির ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। সুয়েজ খাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এবং এলএনজি বাণিজ্যের অন্তত আট শতাংশ পরিবহন হয়। আর বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ আর এলএনজির আট শতাংশ পরিবহন হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে জানা যায়, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারেরই চার কর্মকর্তা বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপে হুতিরা পৌঁছে গেছে। এর আগে দুই সরকারি কর্মকর্তা জানান, পেরিম দ্বীপের মুখোমুখি থাকা ধুবাব নগর হুতিদের দখলে গেছে এবং পেরিম দ্বীপ থেকে সরকারি বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগের দিন বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ নগর বন্দর মোখার দখল নিয়েছে হুতিরা।

সৌদি আরবের পূর্বদিকে থাকা লোহিত সাগর থেকে আরব সাগরে পড়ার একমাত্র জলপথ বাব আল-মান্দেব। দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ। এটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের একটি বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করে। এর আগে যখন হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা চালিয়েছিল, তখন সেখানে নৌ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেবে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হলে বৈশ্বিকভাবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েও জ্বালানি তেলের পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানির বাজার অস্থিতিশীল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে আখেরে সুবিধাজনক অবস্থায় যেতে পারে ইরান।

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) গতকাল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, এ বছর বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ও চাহিদা উভয়েই আগের ধারণার চেয়ে কমে যেতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে।

ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে নিজেদের জ্বালানি পরিবহন করছিল সৌদি আরব। হুতিদের দখলদারত্ব স্থায়ী হলে প্রত্যক্ষভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে দেশটি।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্য নিয়ে ভোগান্তির ঝুঁকিতে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অনেকটাই চড়ে গিয়েছিল। সিএনএনের খবরে জানা যায়, গতকাল দেশটিতে ডিজেলের দাম ছিল গ্যালনপ্রতি প্রায় ছয় দশমিক শূন্য ছয় ডলার।

ইরান যুদ্ধের কারণে অস্থিতিশীল অপরিশোধিত তেলের বাজার গত বৃহস্পতিবার থেকে আরও নাজুক হয়ে ওঠে। সেদিন বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০৫ ডলার ছাড়িয়েছিল। গতকাল তেলের দাম কিছুটা কমলেও অস্থিরতা কাটেনি।

সিএনবিসি নিউজ জানায়, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২১ ডলারে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ৯৯ দশমিক ০৮ ডলারে লেনদেন হতে দেখা গেছে।

তবে হুতিরা বলেছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি সৌদি আরব ছাড়া সবার জন্য নিরাপদ। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গোষ্ঠীটি এক বিবৃতিতে দাবি করে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সবার জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ। আল জাজিরা জানায়, হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে দেশটির জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়া হবে।