ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা দিতে দেশটির ভেতরে ৯ শতাধিক সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে পুয়ের্তো রিকো ও কুরাসাওতে আরও প্রায় ৮০০ সামরিক সদস্য অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
ডোনোভানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিয়েছে। তারা বিমানবন্দর পুনরায় সচল করতে সহায়তা করছে এবং আকাশ ও নৌপথে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করছে।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চার-পাঁচটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মায়ামিভিত্তিক একটি সমন্বিত তথ্যকেন্দ্রের সঙ্গে এসব ড্রোনের তথ্য ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, সড়ক যোগাযোগ এবং ধসে পড়া স্থাপনার অবস্থান শনাক্তে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ডোনোভান বলেন, সাধারণত আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত সক্ষমতাগুলো এখন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাঁর মতে, কিছু পরিস্থিতি আকাশপথ থেকে পর্যবেক্ষণ করা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য মাটির পর্যায় থেকে মূল্যায়নের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ের দুই দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। তবে মাদুরো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ছাড়া গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলার কারাগারভিত্তিক অপরাধী গোষ্ঠী ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’র নেতাকে লক্ষ্য করে আরেকটি অভিযান চালায়। ডোনোভান জানান, ওই অভিযান ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের সমন্বয়েই পরিচালিত হয়েছিল। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে গত বুধবার এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। এতে বহু ভবন ধসে পড়ে এবং হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। উদ্ধার অভিযানের ষষ্ঠ দিনে এসে ভেনেজুয়েলার আইনসভার প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। সে তিন বছর বয়সী একটি শিশু। যদিও উদ্ধার কার্যক্রম এখনো চলছে।
ডোনোভান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন সদস্যরাই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে যুক্ত হন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক উদ্ধারকারী দল পরিবহনেও সহায়তা করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স থেকে যাওয়া একটি দল একজন মা ও তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুকে উদ্ধারের ভিডিও প্রকাশ করেছে।
ত্রাণ কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাকে উল্লেখ করেন ডোনোভান। তাঁর ভাষায়, আন্তর্জাতিক সহায়তা যেন প্রবেশপথে আটকে না পড়ে এবং দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিই এখন প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে দুর্যোগের শুরুর দিকে পর্যাপ্ত ভারী যন্ত্রপাতি ও উদ্ধারকারী দল না পাঠানোয় সমালোচনার মুখে পড়েছে ভেনেজুয়েলা সরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই প্রথম কয়েক দিন হাতে, কোদাল ও দড়ি ব্যবহার করে নিজেরাই স্বজনদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। গত শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারে কিছু এলাকায় ভারী নির্মাণযন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো মরদেহ উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডোনোভান বলেন, কয়েক দশকের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ওষুধ ও হাসপাতালের জনবলসংকট মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কত দিন ভেনেজুয়েলায় সামরিক সহায়তা কার্যক্রম চালাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি ডোনোভান। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে রয়েছে এবং বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কোনো পরিকল্পনা নেই। ডোনোভানের ভাষায়, ‘থেকে যাওয়ার কোনো আলোচনা নেই। ত্রাণ কার্যক্রম শেষ হলে আমরা চলে যাব।’ তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সামরিক সম্পর্কোন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।