হোম > বিশ্ব > লাতিন আমেরিকা

কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৬৫, উদ্ধার অভিযান ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত একটি ভবনে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: এএফপি

লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় সোমবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৯৪ জন এবং এখনও ৪৯৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল বুধবার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া এই তথ্য জানিয়েছেন। এদিকে, ভূমিকম্পের পর প্রায় চাঁর দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধার অভিযান চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটির পর বুধবার উদ্ধার অভিযান ৭২ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার কাছাকাছি পৌঁছায়। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ওই সময়সীমা পেরিয়েও জীবিতদের উদ্ধারের নজির রয়েছে।

কালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের গতকাল বুধবার বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করছি। এর অর্থ এই নয় যে এরপর আর কোনো জীবিত মানুষকে পাওয়া যাবে না, তবে তখন তা আরও কঠিন হয়ে যাবে।’

৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি চলতি শতাব্দীতে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে ৯ হাজার ৫৫০ টির বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। কফি উৎপাদন অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরেইরা শহরে ৮৩ জন এবং দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পেরেইরায় উদ্ধারকারীরা একটি ধসে পড়া বেকারির ধ্বংসস্তূপে অভিযান চালাচ্ছেন। সেখানে সোমবারের ভূমিকম্পের পর আটকে পড়া এক রাস্তার বিক্রেতা এখনও জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কম্পন শনাক্ত করতে সক্ষম বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য প্রাণের সংকেত পেয়েছেন। এতে আটকে থাকা পাবলো লোয়াইজার স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

তাঁর ১৬ বছর বয়সী ভাতিজি সারা লোয়াইজা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘তারা আমাদের বলছে, এটা হয়তো তিনিই। আমার হৃদয় যেন বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।’ স্বজনেরা জানান, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ব্যক্তিকে দুবার, এরপর তিনবার শব্দ করার অনুরোধ করলে তিনি সাড়া দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে।

কালিতে উদ্ধারকারীরা তৃতীয় রাতেও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তারা খালি হাত, ক্রেন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করছেন। শব্দ শনাক্ত করার জন্য নিয়মিত কাজ থামিয়ে পুরো এলাকা নীরবও করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকর্মী জোহানা সানচেজ এএফপিকে বলেন, ‘প্রতি আধা ঘণ্টায় আমরা সবাইকে চুপ থাকতে বলি, যাতে জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় কি না, তা শোনা যায়। এখন পর্যন্ত তিনজনকে জীবিত এবং তিনজনকে মৃত অবস্থায় বের করে আনা হয়েছে।’

কালির দক্ষিণাঞ্চলের তোরেস দেল লিমোনার আবাসিক কমপ্লেক্সে বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ সরাতে হাতে হাতে মালামাল পৌঁছে দেওয়ার মানবশৃঙ্খল তৈরি করেছেন। সৈন্য, মেয়রের কার্যালয়ের কর্মী ও অন্যরা ধ্বংসস্তূপের স্তূপ থেকে একে অপরের হাতে তা তুলে দিচ্ছেন।

বোগোতার ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা কামিলো কানো রয়টার্সকে বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা সীমিত করার পর উদ্ধার অভিযান আরও সংগঠিত হয়েছে। এতে শব্দ ও কম্পন কমেছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে নড়াচড়া শনাক্ত করতে সেন্সরগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে।

প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েয়া ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে একটি জরুরি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভূমিকম্প আঘাত হানার মাত্র তিন দিন আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া দে লা এসপ্রিয়েয়া বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে বিশাল এক ট্র্যাজেডি। আমাদের প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য যারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।’

ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তিনি অর্থনৈতিক জরুরিও ঘোষণা করেছেন। তবে এর আওতায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করেননি। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। তারা পানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন। একই সঙ্গে রক্তদান কেন্দ্রগুলোর বাইরে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

নতুন প্রেসিডেন্টের প্রথম বড় পরীক্ষা

দে লা এসপ্রিয়েয়া চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সফর করেছেন। আগের বামপন্থী সরকারের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয় ছিল সরকারি ব্যয় কমানো এবং নিরাপত্তা জোরদার করা। তাঁর সরকার রাষ্ট্রের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের অর্থায়ন কমানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই ইউনিটই এখন সামনের সারিতে রয়েছে।

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা এএফপিকে বলেন, ‘এই ভূমিকম্পই হবে নতুন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম পরীক্ষা।’ তিনি বলেন, ‘দে লা এসপ্রিয়েয়া সরকারি অর্থব্যয় কমানোর প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনে লড়েছিলেন, যার মধ্যে রাষ্ট্রের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়টিও ছিল। অথচ এই ইউনিটই বর্তমানে জরুরি সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছে।’

কলম্বিয়ার নতুন সরকারের জন্য তাই ভূমিকম্পটি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরও কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।