ভেনেজুয়েলায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই তীব্র কম্পনে ওলটপালট হয়ে গেছে রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির একাধিক রাজ্য। এই জোড়া ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা প্রায় ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) টন টিএনটি বারুদ বিস্ফোরণের সমতুল্য ছিল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভয়াবহ এই জাতীয় বিপর্যয়ের পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত/অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০টা ৪ মিনিটে প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল উপকূলীয় শহর মোরন থেকে ২১ কিলোমিটার (১৩ মাইল) পশ্চিমে এবং ভূগর্ভের ২১ দশমিক ৯ কিলোমিটার গভীরতায়। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর, প্রথম উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভয়াবহ এই জোড়া কম্পনের পর আরও ২০টিরও বেশি আফটারশক (পরবর্তী মৃদু কম্পন) রেকর্ড করা হয়েছে।
ইউএসজিএস তাদের প্রাথমিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এই দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অত্যন্ত ব্যাপক এবং তা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটির অনুমান, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ভূমিধসও শুরু হয়েছে। তবে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত বা আহতের কোনো সরকারি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর ভূপদার্থবিদ বাশান রাইট আল জাজিরাকে জানান, আজ সকালে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দ্বিতীয় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি প্রায় ১০ কোটি টন ট্রাইনাইট্রোটলুইন বা টিএনটি বিস্ফোরণের সমতুল্য ছিল।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, কারাকাসের অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলের আশপাশের ক্ষয়ক্ষতি বিশেষভাবে মারাত্মক হয়েছে। কারাকাসে একটি গভীর পলল অববাহিকা (sediment basin) রয়েছে, যা ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে উঠে আসা ভূকম্পন তরঙ্গকে (seismic waves) আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখনই প্রচুর পলিমাটি সমৃদ্ধ এই ধরনের অববাহিকা থাকে, তখন ভূকম্পন আরও প্রবর্ধিত বা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
১৮২১ সালের একটি ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়কে স্মরণ করে ভেনেজুয়েলায় এদিন সরকারি ছুটি চলছিল। স্পেনের কাছ থেকে দেশটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এই উৎসবে মানুষ যখন ঘরে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহুতল ভবনগুলো ধসে পড়তে শুরু করে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কারাকাসের ৫৪ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা ওদালিস এসকালোনা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘সিঁড়িগুলো মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, পুরো দেয়ালে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছিল। ছাদ থেকে সব জিনিসপত্র নিচে পড়ে যাচ্ছিল। এটা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।’
পশ্চিম কারাকাসের ৪১ বছর বয়সী পাবলিসিস্ট আস্ট্রিড রামিরেজ রয়টার্সকে বলেন, ‘ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার জন্য হুড়োহুড়ি করে দৌড়াচ্ছিল।’
রাজধানী কারাকাসের অভিজাত আলতামিরা এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁয় ঠাসা এই অঞ্চলের একটি ২২ তলা আবাসিক ভবনসহ বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে মানুষের জামাকাপড় এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উঁকি দিচ্ছে। জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা সেখান থেকে অনেককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের বাইরে আটকে পড়া মানুষের স্বজনদের আকুল চিৎকার এবং উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য টর্চলাইট চেয়ে মানুষের আকুতি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা