হোম > বিশ্ব > লাতিন আমেরিকা

ভেনেজুয়েলার অর্ধেকের বেশি তেল যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভেনেজুয়েলার একটি তেলের রিগ। ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলা এখন মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে। ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে কারাকাসে অন্তর্বর্তী সরকার বসানোর সাত মাস পর এই তেল রপ্তানি শুরু হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার হিউস্টনে এক জ্বালানি শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি কাইল হাউস্টভেইট বলেন, ভেনেজুয়েলার দৈনিক মোট তেল উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। এর মধ্যে প্রতিদিন ৫ লাখের বেশি ব্যারেল এখন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই তেল এমন সব শোধনাগারে যাচ্ছে, যেগুলো ‘বিশেষভাবে এই ধরনের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি।’

ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে কয়েক দশকের বিনিয়োগের ঘাটতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির উৎপাদন বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় ১ শতাংশে নেমে এসেছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল যুক্তরাষ্ট্রে যেত।

ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ বা ‘হেভি, সোয়্যার’ ধরনের অপরিশোধিত তেল। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলে থাকা শোধনাগারগুলো এই ধরনের তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি আবার শুরু হওয়া এসব শোধনাগারের জন্য সরাসরি লাভজনক হয়েছে।

‘সুন্দর জ্বালানি অংশীদারত্ব’

হাউস্টভেইট বলেন, ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন বাড়াতেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রতিদিন ১ লাখের বেশি ব্যারেল ন্যাফথা ভেনেজুয়েলায় পাঠাচ্ছে। সেখানে এই ন্যাফথা ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি এই ব্যবস্থাকে ‘একটি সুন্দর জ্বালানি অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, দুই দেশের বাণিজ্যেই ‘উভয় পক্ষের জন্য প্রকৃত মূল্য তৈরি হচ্ছে।’

একই অনুষ্ঠানে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারাও জানান, তারা দেশটির তেল উৎপাদন আরও বাড়ানোর আশা করছেন। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ—এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভানি মার্টিনেজ বলেন, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রতিদিন ১২ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাবে। চলতি বছরে তেল রপ্তানি ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, এ বছর জ্বালানি উৎপাদন ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্টিনেজ বলেন, ‘আমরা জ্বালানি খাতে সংস্কারের জন্য বড় ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছি। এখন আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাস্তব ফলাফল চাই।’

তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার শোধনাগারগুলোকে উন্নত, আধুনিক ও সম্প্রসারিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভারী ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য যে তরল পদার্থ বা ডাইলুয়েন্ট প্রয়োজন, সেগুলোর উৎপাদনও দেশের ভেতরে বাড়াতে হবে।

মাদুরোকে সরানোর পর ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বৃদ্ধির এই ঘটনা ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং দেশটির তেল সম্পদ ব্যবহার করবে। মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরের কয়েক দিনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল থেকে পাওয়া ‘অর্থ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো অর্থ যেন ‘ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উপকারে ব্যবহার করা হয়’ তা নিশ্চিত করা।

পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মার্কিন কংগ্রেসকে জানান, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ ‘এমন একটি হিসাবে জমা হবে, যার ওপর আমাদের নজরদারি থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, কারাকাস ওই হিসাব থেকে প্রতি মাসে বাজেটের জন্য অর্থ চাইবে এবং ওয়াশিংটন আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেবে, কোন কোন কাজে ওই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।

জুলাই মাসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, চলতি বছরে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। গত ২৭ জুলাই ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি। তবে তাঁর প্রশাসন ওই অর্থের কী হয়েছে, সে বিষয়ে প্রায় কিছুই প্রকাশ করেনি। এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, দপ্তরটি ভেনেজুয়েলাকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে।

তেল বিক্রির অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) জুন মাসে বলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করেছে যে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুই দেশেরই উপকার করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনো প্রকাশ্যে জানায়নি, তারা কত পরিমাণ তেল বিক্রি করেছে, কত রাজস্ব সংগ্রহ করেছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করেছে।

তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, যেগুলোর ওপরও ওয়াশিংটন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে। সেটি হলো, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে কারাকাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজকে বাদ দেওয়া।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারটির নেতৃত্বে রয়েছেন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেকলি রদ্রিগেজ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস সতর্ক করে বলেছে, ‘জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা বা স্পষ্ট গণতান্ত্রিক রূপরেখা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র একটি দুর্নীতিগ্রস্ত উত্তরসূরি সরকারকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।’

ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও রয়েছেন। তারা মে মাসে দেশটির জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক রূপরেখায় সম্মত হন। ওই রূপরেখায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন এবং রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর আহ্বান জানানো হয়।