ভেনেজুয়েলায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই তীব্র কম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ দেশজুড়ে ভয়াবহ আতঙ্ক ও ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি হয়েছে। এই বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০ টা ৪ মিনিটে প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল উপকূলীয় শহর মোরন থেকে ২১ কিলোমিটার (১৩ মাইল) পশ্চিমে এবং ভূগর্ভের ২১.৯ কিলোমিটার গভীরতায়। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর, প্রথম উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভয়াবহ এই জোড়া কম্পনের পর আরও ২০টিরও বেশি আফটারশক (পরবর্তী মৃদু কম্পন) রেকর্ড করা হয়েছে।
ইউএসজিএস তাদের প্রাথমিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এই দুর্যোগে আহতের সংখ্যা এবং প্রাণহানি হাজার ছাড়িয়ে লাখে পৌঁছাতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ভূমিধসও শুরু হয়েছে।
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বহুতল ভবনগুলো ধসে পড়তে শুরু করে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে মানুষ কিছু বুঝে ওঠার এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আগেই দ্বিতীয় কম্পনটি আঘাত হানে।
কারাকাসের ৫৪ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা ওদালিস এসকালোনা সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘সিঁড়িগুলো মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, পুরো দেয়ালে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছিল। ছাদ থেকে সব জিনিসপত্র নিচে পড়ে যাচ্ছিল। এটা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা রাজধানীর একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে মানুষের জামাকাপড় এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উঁকি দিচ্ছে; যা নির্দেশ করে যে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার আগে সেখানে একটি আবাসিক ভবন দাঁড়িয়ে ছিল।
একটি ভবনের ভেতরের ফুটেজে ভূমিকম্পের তীব্রতার ভয়াবহ রূপ দেখা গেছে। সেখানে একটি বসার ঘরের টেবিলের ওপর থেকে ফুলদানি আছড়ে পড়তে, দেয়ালে ঝোলানো টেলিভিশন মারাত্মকভাবে কাঁপতে এবং পাশে থাকা একটি সোফাকে তীব্রভাবে সামনে-পেছনে দুলতে দেখা যায়।
ভূমিকম্পের আঘাতে ছাদ ধসে পড়ার পর ভেনেজুয়েলার প্রধান বিমানবন্দর—সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধোঁয়ায় ও ধূলিঝড়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। টার্মিনালটি যখন কাঁপছিল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আলো-আঁধারি তৈরি হয়েছিল, তখন আতঙ্কিত যাত্রীদের হাতে ব্যাগপত্র নিয়ে ভবন থেকে বাইরে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অনেক যাত্রী ভবনের ভেতরেই একটি খাবারের কাউন্টারের নিচে আশ্রয় নেন।
‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির’ কারণে দেশটির প্রধান এই বিমানবন্দরটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়।
উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা থেকে পাওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, জোড়া ভূমিকম্পের পর পুরো এলাকা জনমানবহীন হয়ে পড়েছে। চারদিকের বাতাসে কেবল ধুলোবালি এবং রাস্তাঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে।
আকস্মিক এই বিপর্যয়ের পর দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। তবে ধসে পড়া ভবনের সংখ্যা এবং আফটারশকের কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানতে এখনও অনুসন্ধান চালাচ্ছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ।