ভারতের নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিরোধীদের বিরুদ্ধে তরুণদের উসকে দিয়ে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মতো সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্তের অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস এমপি শশী থারুর এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ বিরোধী নেতারা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তাদের আন্দোলন সরকারকে অবৈধভাবে ফেলার জন্য নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন রক্ষা করার জন্য।
গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কিরেন রিজিজু অভিযোগ করেন, বিরোধী রাজনীতিবিদ এবং ‘ভারত-বিরোধী চক্র’ এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে তরুণদের মাধ্যমে দেশে সহিংসতা ছড়ানোর ষড়যন্ত্র করছে।
কিরেন রিজিজু লেখেন, ‘বাংলাদেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং ফ্রান্সে যে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে—ঠিক তেমনি এক ষড়যন্ত্র ভারতের জন্যও করা হয়েছিল। ভারতবিরোধী চক্র এবং কিছু রাজনীতিবিদ তরুণদের উসকে দিতে এবং আমাদের রাস্তায় সহিংসতা ছড়াতে হাত মিলিয়েছিল।’
রিজিজু আরও জোর দিয়ে বলেন, যারা এই বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা ভুলে গেছে যে ভারত বাংলাদেশও নয়, ফ্রান্সও নয়। ভারতে সরকার পরিবর্তন (Regime Change) পুরোপুরি সম্ভব—তবে তা কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে, ‘সোরোস’-এর মাধ্যমে নয়।
এই বক্তব্যের সঙ্গে রিজিজু অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরা এবং সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের একটি ভিডিও যুক্ত করেন। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে সাম্প্রতিক প্রতিবাদের পর বিজেপি অভিযোগ তোলে যে, বিরোধীরা ‘রেজিম চেঞ্জ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।
সরকারের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। নেহা বোরা এবং কাকরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, আন্দোলনটি কোনো বিরোধী দলের গোপন অভিযান নয়, বরং নির্বাচনী গণতন্ত্র বাঁচানোর একটি প্রয়াস।
তিনি বলেন, ‘এই সরকার বারবার বলছে এটি বিরোধীদের সরকার বদলের অপচেষ্টা। আমরা কেবল দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে বাঁচানোর আবেদন জানাচ্ছি। যদি এই ধরনের বর্বরতা চলতেই থাকে, তবে নিশ্চিতভাবেই সরকার বদল ঘটবে। আমরা সবাই একটি সরকার বদল চাই, এতে ভুল কিছু নেই। সরকার পরিবর্তন করা প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করা কোনো অপরাধ নয়।’
বিজেপির সমালোচনার জবাবে প্রশান্ত ভূষণ স্মরণ করিয়ে দেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপিও অতীতে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে একাধিক জনআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল।
সোমবার কিরেন রিজিজুর বক্তব্যের কড়া জবাব দেন কংগ্রেস এমপি শশী থারুর। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভারত কোনো সহিংসতা সমর্থন করে না এবং বিরোধী দলগুলো কেবল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ বা ফ্রান্সের সঙ্গে ভারতের রাজনীতির তুলনাকে অবান্তর বলে আখ্যা দেন তিনি।
থারুর বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশও নয়, ফ্রান্সও নয়। এই তুলনার কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখি না। ফ্রান্সে বাস বা পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়ার মতো যে সহিংসতা হয়েছে, আমরা কখনোই তা সমর্থন করি না। আমরা কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বিশ্বাস করি। সরকার বদল (Regime Change) শব্দটিকে বিকৃত করার কোনো মানে হয় না। আমাদের মূল দাবি হলো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।’
নির্বাচনী তালিকার অনিয়ম তুলে ধরে থারুর বলেন, ‘আজ উদ্বেগের বিষয় হলো—একটি সম্পূর্ণ ঝঞ্ঝাটপূর্ণ, অনিয়মিত এবং আংশিক বেআইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা কেবল এই ভুলগুলো সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি। এটি একটি সাংবিধানিক বিষয়, সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার কোনো চেষ্টা নয়।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থারুর আরও যোগ করেন, ‘গণতন্ত্র কারও দেওয়া দান নয়; ভারতের সাধারণ নাগরিকরাই এর রক্ষাকর্তা। আমরা কেবল নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংবিধান অনুযায়ী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলছি। আমরা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না, তাদের কাজের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এর আগে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ঘটা আন্দোলনের আদলে তরুণদের ব্যবহার করে দেশে ‘নৈরাজ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছিলেন।
রাজনাথ সিংয়ের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিবাল বলেন, রাজনাথ সিংয়ের এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। দেশের মানুষ বাস্তবে এই সরকারের পরিবর্তন চায় এবং বর্তমান প্রশাসনের এখন ‘বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে।’
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্তান টাইমস