ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া বলেছেন, বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়ার যেকোনো প্রক্রিয়ায়ই হবে ‘সাংবিধানিক ব্যবস্থার অস্বীকার।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘কোনো কর্তৃপক্ষ এটা করতে পারে না, কোনো আদালতও এটিকে অনুমোদন দিতে পারে না।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবর, হায়দরাবাদে দেওয়া এক বক্তব্যে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া বলেন, ‘ভারতের সংবিধানে ভোটাধিকার থাকা এবং ভোটাধিকার না থাকা নাগরিকদের দুটি শ্রেণির কথা বলা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘কোনো প্রক্রিয়ার ফলে যদি কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন, অর্থাৎ নিজ দেশেই ভোটাধিকারহীন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যান, তাহলে সেই প্রক্রিয়া স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী। নানা পাল্টা যুক্তি দেখিয়েও এটিকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না...এটি সংবিধানের একেবারে মূল ভিত্তিতে কুঠারাঘাত।’
তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যেখানে সমতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের বিরোধী, যেখানে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের কথা বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি এমনকি এ কথাও বলব যে, ভারতের সংবিধানের অধীনে আমরা যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, এটি তারই অস্বীকার।’
তবে বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগ বা কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাম উল্লেখ করেননি। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার চার মাস পর বিচারপতি ভূঁইয়ার এই মন্তব্য এলো। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন এবং এর উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া হায়দরাবাদের এনএএলএসএআর ইউনিভার্সিটি অব ল’তে ১৯ তম এনএএলএসএআর–জাস্টিস বিআর সাহনী মেমোরিয়াল মুট কোর্ট কম্পিটিশনের সমাপনী অনুষ্ঠানে এই বক্তব্য দেন। তিনি এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিচারপতি বলেন, ‘একজন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয়ের সঙ্গে ভোট দেওয়ার অধিকার বা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকারকে আলাদা করা যায় না। এটি শরীর থেকে আত্মা বের করে নেওয়ার মতো হবে।’
এসআইআর প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট মে মাসে রায় দিয়েছিল যে, এই কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতার আওতাভুক্ত এবং কমিশন যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, সেগুলো অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালত আরও বলেছিল, কোনো ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট না হলে বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে কিছু বাদ পড়া ভোটারের ক্ষেত্রে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভোটারদের আবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিরোধী দলগুলো এসআইআরকে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ ও ‘অশুভ’ উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এখন পর্যন্ত তিনটি ধাপে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৩ কোটি নাম পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে তারা। নির্বাচন কমিশনের ভেতরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে আসা ভিন্নমতের ঘটনাগুলোর পর এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
গতকাল রোববারের বক্তব্যে বিচারপতি ভূঁইয়া আরও বিস্তৃত অর্থে ভোটাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে ভোটাধিকারের সম্পর্কের কথাও বলেন। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের দীর্ঘ বছরের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, ভোটাধিকার তারই একটি প্রকাশ।’
তিনি বলেন, ‘৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে কোনোভাবেই কারসাজি করা যায় না। কোনো কর্তৃপক্ষ এটা করতে পারে না; কোনো আদালতও এটিকে অনুমোদন দিতে পারে না। সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’ তিনি বলেন, কোনো ভোটার মারা যাওয়ার ঘটনা ছাড়া, ‘একবার কোনো ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে, নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে সেই নাম বাদ দেওয়া যায় না।’
এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ভোটাধিকার ছাড়া একজন নাগরিকের মূল্যই বা কী?’
বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া ১৯৭৯ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আইনবিদ নানি পালখিভালার দেওয়া বক্তব্যের কথা স্মরণ করেন। পালখিভালা বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা রক্তের ধারায় উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া যায় না। প্রতিটি প্রজন্মকে এটি রক্ষা করতে হবে এবং এর জন্য লড়াই করতে হবে। তবেই এটি টিকে থাকবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে।’
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফেলিক্স ফ্রাঙ্কফার্টারের একটি মতের কথা উল্লেখ করে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, একটি গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ পদ প্রেসিডেন্টের নয়, বরং নাগরিকের। ফ্রাঙ্কফার্টারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র সবসময় একটি আহ্বান জানানো লক্ষ্য, কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়; কারণ স্বাধীনতা একটি নিরন্তর প্রচেষ্টা, কখনোই চূড়ান্ত অর্জন নয়।’ বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে ভোট দেওয়া কোনো মৌলিক অধিকার নয়। তবে আদালত এটিকে একটি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাই আমার মতে, একজন ভারতীয় নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার নিজেই মৌলিক কাঠামো মতবাদের কেন্দ্রীয় অংশ।’
সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারকে সংবিধান প্রণেতাদের সাধারণ মানুষের প্রতি ‘আস্থার প্রকাশ’ হিসেবে উল্লেখ করে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া বলেন, ‘একজন হয়তো বিলিয়নিয়ার, আরেকজন হয়তো রিকশাচালক; তবুও দুজনেরই ভোট থাকবে এবং দুজনের ভোটের মূল্য সমান হবে।’