হোম > বিশ্ব > ভারত

ভারতীয় পাসপোর্ট–নথি থাকার পরও বাংলাভাষী মুসলিমকে ‘বাংলাদেশে পাঠিয়েছে’ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আব্দুল বারেক। ছবি: দ্য স্ক্রল

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার ৪৩ বছর বয়সী মুসলিম মাছ ব্যবসায়ী আবদুল বারেককে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সন্দেহ করে আটক এবং পরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রায়গঞ্জ পুলিশের বিরুদ্ধে। বারেকের পরিবারের দাবি, তাঁর কাছে ২০২১ সালে ইস্যু করা ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে এবং ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ভোটও দিয়েছেন। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর–এর পর তাঁর নাম ভোটার তালিকাতেও ছিল।

গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা বারেককে চলতি বছরের জুন মাসে ভারতীয় পুলিশ আটক করে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রলকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটি বারেকের ভোটার তালিকা, ভোটার পরিচয়পত্র এবং ভারতীয় পাসপোর্টের একটি কপি দেখেছে। পরিবারের ভাষ্য, গত ২ জুন দুপুর ৩টার দিকে পুলিশ বারেকের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিচয়পত্র সম্পর্কে জানতে চায়। তখন তিনি বাড়ির কাছের একটি দোকানে বসেছিলেন। পুলিশ তাঁকে ভাটোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।

বারেকের ২৪ বছর বয়সী ছেলে জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রয়োজনীয় সব নথি নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে যান এবং নথি যাচাইয়ের পর তাঁর বাবাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ বারেককে জানায়, পরবর্তী সময়ে কোনো সমন পেলে তাঁকে থানায় হাজির হতে হবে। পরিবারের দাবি, এর প্রায় ১৫ দিন পর পুলিশ বারেককে আবার ডেকে পাঠায়। এবার তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে আটক করা হয়। প্রথমে রায়গঞ্জ থানায় এবং পরে একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

জাহিদুলের অভিযোগ, ‘পুলিশ আমাদের কাগজপত্র একবারও দেখেনি। আমাদের সঙ্গে কথাও বলেনি। তারা জোর করে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিল।’ এর কয়েক দিন পর বাংলাদেশ থেকে ফোন পাওয়ার মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যে বারেককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের জানানো হয়। জাহিদুল বলেন, ‘আড়াই মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেছে, আমরা তাঁকে দেখিনি। তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন, কিছুই জানি না। মাঝে মাঝে তিনি ফোন করেন। কিন্তু আমরা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছি না।’

পরিবারের দাবি, পুলিশ তাঁদের জানিয়েছে যে বারেক ‘বাংলাদেশি হিসেবে প্রমাণিত’ হয়েছেন। তবে তাঁর ছেলে পুলিশের কাছে সেই দাবির পক্ষে নথি দেখতে চাইলে পুলিশ কোনো নথি দেখায়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। জাহিদুল বলেন, ‘আমি পুলিশকে বলেছিলাম, তিনি বাংলাদেশি, সেটা প্রমাণ করে এমন নথি দেখান। কিন্তু পুলিশ কোনো নথি দেখায়নি। তাঁদের কাছে কী প্রমাণ আছে যে তিনি বাংলাদেশি? তাঁরা কোনো বাংলাদেশি পরিচয়ের প্রমাণ দেখাতে পারেনি। কারণ আমার বাবা ভারতীয়।’

জাহিদুলের দাবি, তাঁর বাবা ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তাঁদের পুরো পরিবার ভারতে বসবাস করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বারেকের ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে এবং এসআইআর-এর পর ভোটার তালিকায় নাম থাকার কারণে তিনি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এসব নথি পুলিশ বিবেচনায় নেয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

বারেকের পরিবারে প্রায় ২৩ জন সদস্য রয়েছেন এবং তিনি পরিবারের প্রধান জীবিকা নির্বাহকারী। মাছ চাষের মাধ্যমে তিনি আয় করেন। তাঁর নিজস্ব জমিজমাও রয়েছে। তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পর পরিবারটি আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। জাহিদুল বলেন, ‘আমার পরিবার প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে। আমরা জানি না, তিনি ভিন্ন একটি দেশে কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি অনেক কষ্টে আছেন। আমার মা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। পুলিশ কীভাবে আমার বাবাকে বাংলাদেশে পাঠানোর সাহস পেল?’

রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকার করেন। তিনি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বা সরকারি গোপনীয়তা আইনের কথা উল্লেখ করে তথ্য জানতে ই-মেইল করার পরামর্শ দেন। দ্য স্ক্রল এ বিষয়ে পুলিশকে ই-মেইল করেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, পুলিশের কাছ থেকে জবাব পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

এই বিষয়ে গতকাল বুধবার মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সংগঠনটি বারেককে ‘অবৈধভাবে গ্রেপ্তার, বেআইনিভাবে আটক এবং কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নিখোঁজ করে দেওয়ার’ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে। একই সঙ্গে বারেক বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তা প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে।

আব্দুল বারেকের পাসপোর্টের একটি অংশ। ছবি: দ্য স্ক্রল

সংগঠনটির সম্পাদক কিরিটি রায় বলেন, বারেকের পরিবার বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, পরিবারের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ শুধু কে দায়ী তা নির্ধারণ করা নয়, বরং আবদুল বারেক বর্তমানে কোথায় আছেন, সেটি জানা। কিরিটি রায় বলেন, ভারতীয় পাসপোর্টসহ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা কোনো ব্যক্তিকে পুলিশের প্রশাসনিক দাবি বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক হিসেবে গণ্য করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বারেকের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তা আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বিচারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি এভাবে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারেন না। পুলিশ যাকে গ্রেপ্তার করে বা হেফাজতে নেয়, তাঁর বিষয়ে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে। কোনো নাগরিকের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও অবস্থান কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ইচ্ছা বা নীরবতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।’

এদিকে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে বিজেপিশাসিত ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পুলিশ বাংলাভাষী ব্যক্তিদের আটক করছে। এসব ব্যক্তির বেশিরভাগই মুসলিম। তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হচ্ছে। কয়েকজনকে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে না পারার অভিযোগে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভুল করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া ব্যক্তিরা পরে ভারতে ফিরে এসেছেন, কারণ সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজ্য কর্তৃপক্ষ পরে নিশ্চিত করেছে যে তাঁরা ভারতীয় নাগরিক।

পশ্চিমবঙ্গে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতি

মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজ্য সরকার কথিত নথিপত্রহীন অভিবাসীদের রাখার জন্য হোল্ডিং সেন্টার বা আটককেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়। এটি সরকারের ঘোষিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ বা ‘শনাক্ত করো, তালিকা থেকে বাদ দাও, বহিষ্কার করো’ নীতির অংশ হিসেবে জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ অন্তত ১৬ জন মুসলিম পুরুষ ও দুই শিশুকে আটক করেছে এবং তাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। আবদুল বারেকের ঘটনাটি যুক্ত হলে এ ধরনের আটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭ জনে।