হোম > বিশ্ব > ভারত

অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশে’ দৈনিক লোকসান ১ কোটি রুপি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

গত ১৯ আগস্ট ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি লজে ভয়াবহ আগুনে নয়জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। সেই আগুনের আঁচ এখন পড়েছে পাশের নিউ মার্কেট এবং সংলগ্ন বাণিজ্যিক এলাকা তথা ‘মিনি বাংলাদেশ’ এলাকাজুড়ে। হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশি ক্রেতার সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।

আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহ থেকে এখন পর্যন্ত নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় পোশাক, প্রসাধনী, লাগেজ, শুকনো ফল ও চকলেটের ব্যবসা করা প্রায় ৫ হাজার দোকান প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ কোটি রুপি করে লোকসান গুনছে। জুনের শেষ দিকে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া আবার শুরু করার পর এই দোকানগুলোতে বিক্রি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড এবং এর পরপরই হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া থমকে গেছে এবং ব্যবসাগুলো আবারও লোকসানের মুখে পড়েছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিউ মার্কেট, হুমায়ুন প্লেস, বার্ট্রাম স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দোকানগুলো বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব ক্রেতা মোট ক্রেতা সমাগমের অর্ধেকেরও বেশি এবং মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিলেন। নিউ মার্কেটের বি ব্লকে স্যুটের কাপড় বিক্রি করা আম্রপালিতে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দোকানটির মোট ক্রেতার ৬০ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি।

আম্রপালি নামের শো-রুমটির কর্মকর্তা মনোজ আদওয়ানি বলেন, ‘দুই বছরের বিরতির পর যখন পর্যটন ভিসা আবার চালু হলো, তখন ক্রেতারা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের মোট ক্রেতার প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি। কিন্তু হোটেলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হওয়ায় এবং বাংলাদেশিদের অন্য এলাকায় চলে যেতে অথবা দেশে ফিরে যেতে হওয়ায় এখন বাংলাদেশি ক্রেতার সংখ্যা ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।’

মানসা শাড়ির তরুণ ইসরানি বলেন, তাঁর দোকানের ব্যবসার প্রায় ৭০ শতাংশই আসত বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী শাড়ি মজুত করি। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তা কমে ১৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। ভিসা আবার চালু হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে বাড়ছিল এবং অগ্নিকাণ্ড ও হোটেল বন্ধ হওয়ার আগে ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। এক সপ্তাহ আগে তা ১০ শতাংশে নেমেছিল এবং এখন দ্রুত আরও কমছে।’

সালোয়ার-কামিজ বিক্রি করা ফ্যান্সি বুটিকে মন্দার আগে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্রেতাই ছিলেন বাংলাদেশি। বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়ার আগে সেই সংখ্যা কমে ১৫ শতাংশে নেমেছিল। এখন তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন দোকানটির মালিক অমিত সাহা।

নিউ মার্কেটের ২ হাজার ৭০০টি দোকানের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দোকানে বাংলাদেশি ক্রেতারা নিয়মিত আসেন। এসব দোকানে মূলত পোশাক, প্রসাধনী, ভ্রমণের সামগ্রী, ব্যাগ, চকলেট, শুকনো ফল ও গোটা মসলা বিক্রি হয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, লিন্ডসে স্ট্রিট, হুমায়ুন প্লেস, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটের আরও ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার দোকান বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এসএস হগ মার্কেট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক উদয় কুমার শাও বলেন, ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুনের গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই এলাকার একটি দোকানে দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার রুপির লেনদেন হতো। ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ দোকানে মোট দৈনিক লেনদেন ছিল প্রায় ৮ কোটি রুপি। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবসা আসত বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে। তাঁরা প্রতিদিন এই বাণিজ্যিক এলাকায় কেনাকাটায় প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ রুপি খরচ করতেন।’

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি দোকানের গড় দৈনিক বিক্রি কমে প্রায় ৬ হাজার রুপিতে নেমে আসে। ওই এলাকার দৈনিক মোট লেনদেন ৮ কোটি রুপি থেকে কমে ৩ কোটি রুপিতে দাঁড়ায়। জুনের শেষ দিকে ভারত আবার ভিসা দেওয়া শুরু করার পর গড় দৈনিক বিক্রি বেড়ে ৮ হাজার রুপি হয়। তখন প্রায় ১ কোটি রুপির দৈনিক মোট লেনদেনের প্রায় ২০ শতাংশ আসত বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এখন বিক্রি আবার কমে দৈনিক প্রায় ৬ হাজার রুপিতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রায় কোনো ব্যবসাই হচ্ছে না। শাও বলেন, ‘যাঁরা কেনাকাটার জন্য এখানে ছিলেন, তাঁরা ফিরে গেছেন। আর যাঁরা চিকিৎসার জন্য এই এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং হাসপাতালে না থাকার সময় কেনাকাটা করতেন, তাঁরা এখন মুকুন্দপুর ও সল্টলেকে চলে গেছেন। তাঁরা এত দূর এসে এখানে কেনাকাটা করতে আসবেন না।’