কলকাতার এক চিরাচরিত সকাল। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন নেতা-কর্মীরা। তেমনই প্রচারে দেখা গেল ব্যারাকপুরের বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচীকে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর লাল ধুতি। পেছনে ঢোলের তালে তাঁর নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছেন সমর্থকেরা। তবে এসব ছাপিয়ে সবার নজর কাড়ছে তাঁর হাতে থাকা মাছ।
ব্যারাকপুর আসনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী। আইনজীবী থেকে রাজনীতিতে আসা কৌস্তভ দিচ্ছেন না কোনো নীতি-নির্ধারণী বক্তৃতা, বরং অনেকটা নীরবে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। শুধু হাতে তাঁর মাছ, যা দিয়ে জনগণের মনে ঠাঁই নিতে চাচ্ছেন, তাঁদের জানাতে চাচ্ছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক।’
কয়েক কিলোমিটার দূরে কলকাতার বন্দর এলাকায় বিজেপির আরেক প্রার্থী রাকেশ সিংকেও একই ভঙ্গিমায় দেখা গেল। শহরের মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে হাইপ্রোফাইল লড়াইয়ে নামা রাকেশ সাতসকালে কর্মীদের নিয়ে প্রচারের সময় বারবার মাছ উঁচিয়ে ধরছিলেন।
বাংলায় মাছ কেবল খাবার নয়, এটি রসনা তৃপ্তির প্রধান অনুষঙ্গ, যা মানুষের স্মৃতি, আচার ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি বাঙালির পরিচয় ও আপনজন হওয়ার এক অনন্য মানদণ্ড। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এখন সেই মাছকেই রাজনীতির ময়দানে নামানো হয়েছে একটি বিশেষ ভয় বা উদ্বেগ দূর করার অস্ত্র হিসেবে।
ভারতে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রাজনীতি বেশ পুরোনো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপিকে সাধারণত নিরামিষভোজী সংস্কৃতির প্রবর্তক হিসেবে দেখা হয়। বিজেপি শাসিত কিছু রাজ্যে মাংস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা বা গরু রক্ষা সংক্রান্ত কড়াকড়ি এই ধারণাকে আরও মজবুত করেছে, যদিও ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী আমিষভোজী। এই নির্বাচনে মাছ থালা থেকে উঠে এসেছে প্রচারের কেন্দ্রে। হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রমাণ এবং ‘হস্তক্ষেপ’-এর অভিযোগের জবাব।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী ও টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন, বিজেপি বাংলার জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানছে। সম্প্রতি এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘বিজেপি আপনাদের মাছ খেতে দেবে না। এমনকি মাংস বা ডিমও খেতে দেবে না।’
৭১ বছর বয়সী এই লড়াকু নেত্রী আরেক সভায় বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, ‘বাংলা মাছ-ভাতে বাঁচে। আর আপনারা বলছেন, মাছ খেতে পারবেন না, মাংস খেতে পারবেন না, ডিম খেতে পারবেন না, তাহলে বাংলার মানুষ খাবেটা কী?’
বিজেপিও বসে নেই। তারাও পাল্টা জবাব দিয়েছে। অস্বীকার করেছে সব অভিযোগ। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেত্রী স্মৃতি ইরানি এসব বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ অভিহিত করে বলেন, ‘মাছ-ভাত বাংলার সংস্কৃতির অংশ, যা কোনো ইতি নেই।’
রাসবিহারী আসনের বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্ত এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল তাদের দুর্নীতি থেকে নজর ঘোরাতেই মাছ নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। আমরা মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ করব, এসব সম্পূর্ণ অর্থহীন কথাবার্তা।’
এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেও নির্বাচনি প্রচারে মাছের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন, তবে ভিন্ন আঙ্গিকে। নিরামিষভোজী মোদি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলাকে মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও তৃণমূল আপনাদের মাছের চাহিদা মেটাতে পারেনি। মাছ অন্য রাজ্য থেকে আনতে হচ্ছে।’
এর জবাবে মমতা জানান, বাংলার মাছের চাহিদার ৮০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে পূরণ হয়। তিনি উল্টো প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনারা বিজেপি শাসিত বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানে মাছ খেতে দেন না কেন? দিল্লিতে মাছের দোকানে হামলা করা হয় কেন?’
মাছ এখন কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রায়ও মাছ নিয়ে হেঁটেছিলেন নেতারা।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী দেশ হলেও মাথাপিছু মাছ খাওয়ার তালিকায় এর অবস্থান ১২৯ তম। তবে পশ্চিমবঙ্গের চিত্র ভিন্ন। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ খান। ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মাছ খান।
বাংলা সাহিত্যেও মাছের উপস্থিতি ব্যাপক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে মাছ হলো ভাগ্য আর টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। অমিতাভ ঘোষের ‘দ্য হাংরি টাইড’-এ এটি সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে মিশে আছে। লেখক সামান্ত সুব্রামানিয়ান ইলিশের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বাঙালি রান্না যদি উইম্বলডন হয়, তবে ইলিশ সবসময় সেন্টার কোর্টে খেলবে।’
মাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূগোল (গঙ্গা বনাম পদ্মা), ইতিহাস (দেশভাগ) এবং শ্রেণি বৈষম্যের নানা স্তর। এমনকি মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের চিরকালীন লড়াইয়েও চিংড়ি বনাম ইলিশের দ্বন্দ্ব চিরচেনা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই গভীর প্রতীকী মূল্যের কারণেই মাছ এখন রাজনীতির মঞ্চে টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঐতিহাসিক জয়ন্ত সেনগুপ্ত মনে করেন, বিজেপি নিরামিষভোজী সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় শাসক দল তৃণমূল মাছকে বাঙালি সাংস্কৃতিক গর্বের অংশ হিসেবে প্রচার করছে। এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে বিজেপিও বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারছে না।
গত সপ্তাহে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের ৪ মে ভোটের ফলের দিন ভাজা মাছ খাওয়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিজেপি জিতলে মমতার বাড়িতে নানা ধরনের ‘ছোট মাছ’ পাঠানো হবে এবং তৃণমূল কর্মীদের ‘মাছ-ভাত’ খাওয়ানো হবে। রসিকতার ছলে তিনি আসলে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় আসছে।
নির্বাচনে পরিচয় বা জীবিকা বড় ইস্যু হলেও মাছ হয়তো ভোটের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে না। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই এই নির্বাচনি লড়াইয়ের একটি প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বুঝিয়ে দিচ্ছে বাংলার রাজনীতি আর সংস্কৃতি কতটা অবিচ্ছেদ্য।