হোম > বিশ্ব > ভারত

আড়াই লাখ কোটি রুপির মেট্রোরেলে কেন আশানুরূপ যাত্রী পাচ্ছে না ভারত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিপুল অর্থ ব্যয়ে ভারতজুড়ে মেট্রোরেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলেও যাত্রী নেই আশানুরূপ। ছবি: এএফপি

গত মাসে এক পূর্ণ কর্মদিবসের সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের দক্ষিণগামী অ্যাকোয়া লাইন মেট্রো ট্রেনটি শেষ স্টেশনের অনেক আগেই খালি হয়ে যায়। যাত্রা শুরুর কয়েকটি স্টপেজ পার হওয়ার আগেই এই অবস্থা দেখা যায়। ট্রেন থেকে নামার পর দেখা যায়, শেষ স্টেশনটির চেহারা কোনো জনাকীর্ণ রেল টার্মিনাল বরং, যেন একেবারে সোভিয়েত আমলের পরিত্যক্ত কোনো স্থাপনা। অথচ এই শহরে সাধারণত গণপরিবহন মানেই ঠাসাঠাসি, জায়গা নিয়ে লড়াই।

অ্যাকোয়া লাইন মুম্বাই শহরের নতুন মেট্রো রুট, যার পুরোটাই ভূগর্ভস্থ। এই মেট্রো রুট পুরোনো বাণিজ্যিক এলাকা কাফে প্যারেডকে যুক্ত করেছে নতুন ব্যবসায়িক কেন্দ্র যেমন বিকেসি এবং উত্তরের উপশহরের বিমানবন্দর টার্মিনালগুলোর সঙ্গে। চালু হয়েছে গত বছর।

প্রায় সাড়ে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রো করিডরটি ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীর যানজট কমাবে বলে আশা করা হয়েছিল এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, বাস্তবে যাত্রী সংখ্যা তার প্রায় এক-দশমাংশ। কাফে প্যারেড স্টেশনে বিবিসিকে এক টিকিটিং কর্মকর্তা বলেন, ‘এই লাইনে খুব বেশি মানুষ উঠছে না। ভাড়া বেশি।’

এই করিডরের কম যাত্রীসংখ্যা আসলে ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত মেট্রো নেটওয়ার্কের একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ। ২০১৪ সালের পর থেকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় আড়াই লাখ কোটি রুপি (২ লাখ ৪১ হাজার কোটি রুপির বেশি) রুপির বেশি ব্যয় করা হয়েছে প্রায় দুই ডজন ভারতীয় শহরে মেট্রো সংযোগ গড়ে তুলতে। এই নেটওয়ার্ক আগে ছিল ৩০০ কিলোমিটারেরও কম। ২০২৫ সালের এই মেট্রো লাইন বেড়ে দাঁড়ায় ১ কিলোমিটারেরও বেশি, অর্থাৎ চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দৈনিক গড় যাত্রীসংখ্যাও প্রায় চার গুণ বেড়ে ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়েছে গত এক দশকে।

তবে এই বড় বড় সামগ্রিক পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বেশির ভাগ মেট্রোব্যবস্থা পরিকল্পনার সময় যে যাত্রীসংখ্যা অনুমান করা হয়েছিল, তার সামান্য অংশও অর্জন করতে পারেনি। ২০২৩ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) দিল্লির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন করিডরে যাত্রীসংখ্যা ছিল অনুমানের মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ। গবেষণার এক লেখক বিবিসিকে জানান, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও এই চিত্র খুব একটা বদলায়নি।

অন্যান্য গবেষণাও একই ধরনের ফলাফল দেখিয়েছে। ভারতের প্রখ্যাত থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কানপুরের মতো তৃতীয় স্তরের শহরগুলোতে যাত্রীসংখ্যা অনুমান যা করা হয়েছিল তার মাত্র ২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। আর দক্ষিণ ভারতের শহর চেন্নাইয়ে প্রথম পর্যায়ে তা ছিল ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট ফর ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পলিসির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ভারতের পুনে এবং নাগপুরের মতো শহরগুলোতে প্রকৃত যাত্রীসংখ্যা ছিল অনুমানের ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।

ভারতের রাজধানী দিল্লি—যেখানে দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত মেট্রো নেটওয়ার্ক রয়েছে—সেখানে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখানে ব্যবহার কিছুটা অনুমান ছাড়িয়ে গেছে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞ আদিত্য রানে এবং বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্টেশন ল্যাবের আশিস ভার্মা বলেন, এর কারণ হলো দিল্লি এখন প্রতিটি ইন্টারচেঞ্জকে আলাদা ট্রিপ হিসেবে গণনা শুরু করেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এমন একটি দেশে যেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি এখনো কম, আর অন্যান্য গণপরিবহনব্যবস্থা অতিরিক্ত ভিড়ে নাজেহাল, সেখানে মেট্রো যাত্রা কেন প্রত্যাশামতো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না? ভার্মার মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর শুরু হয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূর্বাভাসে ভুল থেকে। তিনি বলেন, ‘চাহিদা নির্ধারণ ও নির্ণয় করা খুবই জটিল কাজ এবং অনেক সময় প্রকল্পকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক দেখাতে সংখ্যাগুলো বাড়িয়ে দেখানো হয়।’

তিনি আরও জানান, অনেক সময় পূর্বাভাস করা হয় ট্রেনের ‘প্রস্তাবিত সক্ষমতা’ ধরে। যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক কোচ বা ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি। কিন্তু বাস্তবে এসব অনেক ক্ষেত্রেই অর্জিত হয়নি বা হয় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরে বলেন—বেঙ্গালুরুতে সবচেয়ে ব্যস্ত লাইনে পিক আওয়ারে ট্রেনের হেডওয়ে বা দুটি ট্রেনের মধ্যকার ব্যবধান পাঁচ মিনিট বা তার বেশি। আর নতুন একটি লাইনে তা বেড়ে ২৫ মিনিট পর্যন্ত হয়।

একইভাবে, অনেক ট্রেনে কোচের সংখ্যা তিন থেকে ছয়ের মধ্যে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত মেট্রো ব্যবস্থাগুলোতে সাধারণত নয়টি কোচ থাকে এবং প্রতি দেড় মিনিটে একটি করে ট্রেন চলে। এ ছাড়া ভাড়া বেশি হওয়াও বা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা—আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যেমন মুম্বাইয়ের অ্যাকুয়া লাইনে একবার যাত্রার ভাড়া ১০ থেকে ৭০ রুপি। অন্যদিকে, মুম্বাইয়ের স্থানীয় উপনগরীয় রেলওয়েতে তিন মাসের আনলিমিটেড ট্রাভেল পাসের খরচ মাত্র ৫৯০ রুপি—যা তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা।

রানে বলেন, ‘ভারতের মেট্রোব্যবস্থায় সমন্বিত যাত্রায় খরচ নিম্ন-আয়ের মানুষদের আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত চলে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ড ১০-১৫ শতাংশের চেয়েও বেশি।’ ভার্মা উল্লেখ করেন, ভর্তুকি কমানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা ভারতের মতো মূল্য সংবেদনশীল দেশে সব সময় ভালো সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।

এর প্রমাণ মিলেছে বেঙ্গালুরুতে। গত বছর মেট্রোর ভাড়া বাড়ানোর পর নাগরিকদের বিক্ষোভ দেখা যায়। নাগরিক অধিকার সংগঠন গ্রিনপিসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ভাড়া বৃদ্ধির পর যাত্রীসংখ্যা প্রায় ১৩ শতাংশ কমে যায়। ভার্মা বলেন, ‘এমনকি লন্ডনের টিউব এখনো ব্যাপকভাবে ভর্তুকি পায়। কারণ এর একটি উদ্দেশ্য আছে—আপনি টেকসই পরিবহন নিশ্চিত করতে চান এবং শহরের যানজট কমাতে চান।’ ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও, লন্ডনের টিউব এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গণপরিবহন ব্যবস্থাগুলোর একটি।

চাহিদা কম থাকার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে—যেমন দুর্বল নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা এবং সংযোগের অভাব। অবজারভার রিচার্স ফাউন্ডেশনের আরবান স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো নন্দন দাওদা বলেন, ‘মানুষ তখনই গণপরিবহনে ঝুঁকবে, যখন অপেক্ষার সময় যতটা সম্ভব কম হবে।’ তিনি বলেন, ভারতে বড় একটি সমস্যা হলো পর্যাপ্ত ফিডার বাসের অভাব, যা মেট্রো থেকে প্রয়োজনীয় গন্তব্যে সংযোগ নিশ্চিত করতে পারে না।

দুটি রুটের মধ্যে যাতায়াতের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে বেশি এবং জটিল। উদাহরণ হিসেবে দিল্লির হাউস খাস স্টেশনে এক লাইন থেকে আরেক লাইনে যেতে প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় লেগে যায়।

দাওদা বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা’ এই সমস্যার সমাধানে একটি বড় বাধা। একই শহরের বিভিন্ন মেট্রো লাইন ও বাস নেটওয়ার্ক আলাদা আলাদা অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যারা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ছাড়াই কাজ করে। তিনি আরও বলেন, ‘এগুলোর মধ্যে আরও ভালো পরিচালনাগত সমন্বয় প্রয়োজন।’

ভারতে আরেকটি সমস্যা হলো দুর্বল হাঁটার পথ এবং নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। ভার্মা বলেন, ‘মেট্রো স্টেশন থেকে অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াত সহজ ও সুবিধাজনক না হলে গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়বে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি দিল্লির মতো শহরেও একজন পর্যটক হই, তাহলে আমার ব্যাগ টেনে মেট্রোতে ওঠা এবং সেখান থেকে ৫০০ মিটার দূরের হোটেল পর্যন্ত হাঁটা সহজ নয়।’

উত্তর দিল্লির বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী চেতনা যাদবের জন্য নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। তিনি বলেন, ‘সূর্যাস্তের পর আমি মেট্রোর ওপর নির্ভর করতে পারি না। আমার বাসা স্টেশন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে, আর রাতে শেষ স্টেশনে পৌঁছানোর পর বাসায় ফেরার জন্য ক্যাব পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। আমি কয়েকবার এমন পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছি।’

তবুও, এত সব সমস্যার পরেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধীরে ধীরে মেট্রোর ব্যবহার বাড়তেই থাকবে। অনেক ভারতীয় শহরে যানজট, দূষণ, পার্কিং এবং সড়ক নিরাপত্তার সমস্যা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর কনজেশন প্রাইস (যার মাধ্যমে ব্যস্ততম সময়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করতে বা নির্দিষ্ট রাস্তা ব্যবহার করার জন্য চালকদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হয়) চালুর দাবিও জোরালো হচ্ছে। তবে সস্তা ও নির্বিঘ্ন মেট্রো যাত্রার নিশ্চয়তা ছাড়া দ্রুত এবং বড় পরিসরে ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা কম।

রানে বলেন, ‘যেসব ব্যবস্থা বাসের সঙ্গে সমন্বয়, স্টেশনে সহজ প্রবেশ এবং ভাড়ার সমন্বয় ঠিকভাবে করতে পারবে, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি উন্নতি করবে। না হলে ভারত এমন মেট্রো তৈরি করতে থাকবে, যা কার্যকর হলেও প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না।’

বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ভারতের তামিলনাড়ুতে আতশবাজি কারখানায় বিস্ফোরণে নিহত অন্তত ২০

ঝাড়গ্রামে ভোটের প্রচারের ফাঁকে ঝালমুড়ি খেলেন নরেন্দ্র মোদি

ইরানি তেলের দাম চীনা মুদ্রায় চোকাচ্ছে ভারত

ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হচ্ছেন দীনেশ ত্রিবেদী: হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন

দুই যমজ মেয়ের গলা কেটে পুলিশকে ফোন দিলেন বাবা

যুদ্ধবিমানের ‘হার্ড ল্যান্ডিং’, পুনে বিমানবন্দরের রানওয়ে বন্ধ

সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিল পাস করাতে পারলেন না মোদি

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি পরীক্ষা করছে ভারত

‘কিমোনো’ ফেরত দিতে দেরি, জাপানে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ভারতীয় পরিবার

ভারতে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ১৮০ কিশোরীর অশ্লীল ভিডিও ধারণ, তরুণ গ্রেপ্তার