ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদে তিন বোনের বহুতল থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাথমিক তদন্তে একে ‘গণ-আত্মহত্যা’ মনে করা হলেও, এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, এক বোন ঝাঁপ দিতে গেলে বাকি দুইজন তাকে বাঁচাতে গিয়েই সম্ভবত নিচে পড়ে যায়।
গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিট নাগাদ গাজিয়াবাদের ভারত সিটি আবাসন চত্বরে এই ঘটনা ঘটে। মৃত তিন বোনের নাম বিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) এবং পাখি (১২।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী অরুণ সিং ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানান, রাত ২টা নাগাদ তিনি যখন নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন পাশের ব্লকের নবম তলার একটি ব্যালকনিতে কাউকে রেলিংয়ে বসে থাকতে দেখেন। অরুণ বলেন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো দম্পতির মধ্যে অশান্তি হচ্ছে। দেখলাম একজন ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করছে আর একজন তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে। একবার তাকে টেনে নামাতে সক্ষমও হয় অন্যজন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ফের ওই কিশোরী রেলিংয়ে উঠে বসে। তখন আর একটি বাচ্চা মেয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে নামানোর চেষ্টা করে। আমি ফোন বের করে কাউকে ডাকার আগেই তিনজন একসঙ্গে নিচে পড়ে যায়। মনে হচ্ছিল একজন ঝাঁপ দিতে মরিয়া, আর বাকি দুইজন তাকে বাঁচাতে গিয়েই ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে গেল।’
অরুণ সিং আরও বলেন, অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে সেটি পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেয়। এই বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে দেশে ১০ মিনিটে পিৎজা বা গ্রোসারি ডেলিভারি হয়, সেখানে জীবন বাঁচাতে অ্যাম্বুলেন্স আসতে এক ঘণ্টা লাগে—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি আট পাতার সুইসাইড নোট এবং একটি পকেট ডায়েরি উদ্ধার করেছে। ডায়েরির পাতায় উঠে এসেছে অনলাইন গেমিং এবং মোবাইলে অতিরিক্ত আসক্তির কথা। জানা গেছে, তিন বোনই কোরিয়ান একটি অনলাইন টাস্ক-ভিত্তিক গেমের প্রতি মারাত্মক আসক্ত ছিল। এমনকি তারা নিজেদের আসল নাম বদলে কোরিয়ান নামও গ্রহণ করেছিল।
মৃতদের বাবা চেতন কুমার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘ওরা বলত—কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়া আমাদের ভালোবাসা। তোমরা যাই বলো, আমরা এটা ছাড়তে পারব না।’ দুই বছর ধরে মেয়েগুলো স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবা-মা তাদের মোবাইলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা কিশোরীদের শোয়ার ঘরের দেওয়ালে বিষণ্নতার নানা বার্তা খুঁজে পেয়েছেন। দেয়ালে লেখা— ‘আমি খুব একা’ এবং ‘হৃদয় ভেঙে চুরমার’। সুইসাইড নোটে লেখা, ‘এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে তা সত্যি। সবটা পড়ে নিও। সরি পাপা।’ নোটের শেষে একটি হাতে আঁকা কান্নার ইমোজিও রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, মেজ বোন প্রাচীই ছিল এসব কিছুর নেপথ্যে। ব্যালকনির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে তারা চার ফুট উঁচু রেলিং টপকাতে একটি ছোট টুল ব্যবহার করেছিল। তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত আত্মহত্যা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ এখন ওই গেমটির উৎস এবং কিশোরীদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খতিয়ে দেখছে।