হোম > বিশ্ব > ভারত

চাপে পড়ে ১৩ কোটি নাম ভোটার তালিকায় ফেরাতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) দেশজুড়ে চালানো স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানতে পেরেছে, এই পরিস্থিতিতে যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, সেখানে বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে ‘বিশেষ অভিযান’ চালানোর নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

খবরে বলা হয়েছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক লিখিত চিঠিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গতকাল বৃহস্পতিবার সব রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের (সিইও) সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে বিষয়টি আবারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া নিয়ে যখন নির্বাচন কমিশন তীব্র নজরদারির মধ্যে রয়েছে, তখনই এই পদক্ষেপটি সামনে এল। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে—ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে আর কার নাম বাদ যাবে, তা নিয়ে খোদ কমিশনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠছিল।

সেই অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী তাঁদের অজান্তে কমিশনের নামে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল ‘ফরম–৬’ (নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ফরম)-এ আনা পরিবর্তন এবং ‘ইসিআইনেট’-এর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এসআইআর চলাকালীন এই সফটওয়্যারের মাধ্যমেই ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছিল এবং বর্তমানে সমস্ত ভোটার তালিকা এই সফটওয়্যারেই রয়েছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সচিবের পক্ষ থেকে সব সিইও-দের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘যেসব রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, সেখানে বাদ পড়ে যাওয়া এবং নতুন/প্রথমবারের মতো যোগ্য ভোটারদের ধারাবাহিক হালনাগাদ প্রক্রিয়ার অধীনে নাম তোলার জন্য মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা (সিইও), জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা (ডিইও) এবং ইআরও-দের মাধ্যমে একটি বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।’

জুলাই মাসে ফরম ৬-এ যে অতিরিক্ত প্রশ্নটি যোগ করা হয়েছিল, এই নতুন অভিযানে সেটি আর থাকছে না। এতদিন অনলাইনে নতুন ভোটার আবেদন করতে গেলে প্রশ্ন করা হতো—সর্বশেষ এসআইআর-এর পর তারা বা তাদের বাবা-মা ভোটার তালিকায় ছিলেন কি না। এর উত্তর না দিয়ে ফরম জমা দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে যেসব ১৮ বছর বয়সী তরুণের বাবা-মায়ের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, তাদের জন্য সত্যি উত্তর দিয়ে আবেদন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সরকারি নিয়ম সংশোধন না করে কেবল সরকারই ফরমে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু সরকার কোনো আইন সংশোধন করেনি। মে মাসেই দুই কমিশনার এ বিষয়ে কথা বলেন এবং আগস্ট মাসে সান্ধু এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত/অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেন। ২৯ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে এই ঘোষণাটি এখন কেবল ‘এসআইআর ধাপের জন্য’ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে যে ২০টি রাজ্যে এসআইআর শেষ হয়েছে, সেখানে প্রথমবার ভোটার হতে যাওয়া ও বাদ পড়ে যাওয়া ব্যক্তিরা আগের মূল আইনগত ফরমটিই ব্যবহার করতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার রাজ্যের সিইওদের সাথে নির্বাচন কমিশনের ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মতে, নির্দেশনাটি আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার সিইওদের বলেন, এসআইআর-পূর্ববর্তী তালিকা ও এসআইআর-পরবর্তী তালিকা তুলনা করতে, বাদ পড়াদের তালিকা তৈরি করতে এবং অন্যায়ভাবে কেউ বাদ পড়েছেন কি না তা চিহ্নিত করতে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, ‘তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বিশেষ করে যেসব ভোটার অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হননি, ভুয়া ভোটার নন বা মারা যাননি, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে হবে এবং তাদের ফরম ৬ পূরণ করিয়ে নিতে হবে।’ এই কাজের জন্য সিইও-দের রাজনৈতিক দলগুলোর (বা রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেলের এজেন্টদের) সাহায্য নিতে বলা হয়েছে।

সব সিইওকে বলা হয়েছে, অন্যায়ভাবে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তাদের ফরম ৬-এর মাধ্যমে অর্থাৎ নতুন ভোটারের নিয়মেই তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা (সিইও)-কেও গত ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯৭ জন ভোটারকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, খসড়া তালিকায় এই ৯৭ জনের নাম বাদ পড়েছিল।

পরে তারা কাগজপত্র জমা দেন এবং ইআরওরা (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) তদন্ত করে তাদের যোগ্য ঘোষণা করেন। কিন্তু ইআরওরা দেখতে পান, বাদ দেওয়ার নির্দেশটি উল্টানোর (রিভার্স করার) কোনো অপশন ইসিআইনেট সফটওয়্যারে ছিল না। সিইও এ বিষয়ে সাত দিনে আটবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠান এবং আইটি বিভাগের ডিজি সীমা খান্নাকে চিঠির কপি দেন, কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। ফলে ওই ৯৭ জনকে বাদ দিয়েই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল।

গত ১৪ আগস্ট কমিশনার সান্ধু লিখিতভাবে এই উদ্বেগটিই প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লেখেন, আইন অনুযায়ী ‘ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সমস্ত দায়িত্ব ইআরও, ডিইও এবং সিইও-দের ওপর ন্যস্ত’, কিন্তু ‘আইটি বিভাগের ডিজি সফটওয়্যারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন।’ অথচ ‘আইন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার আইটি ডিজির নেই।’

মে মাসে অপর কমিশনার জোশী একে ‘ভোটার তালিকা ডাটাবেজের ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণ’ বলে অভিহিত করেন এবং সফটওয়্যারটির অডিট করার দাবি জানান। গত ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত এই দুটি চিঠির কোনোটিরই জবাব দেওয়া হয়নি। মে মাসের পর এটিই ছিল কমিশনের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ বৈঠক।

সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ‘আনম্যাপড’ (যাদের তথ্য মে মেলেনি) বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যুক্তিসংগত অসঙ্গতি)-র কারণে যাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের কোনো শুনানি বা ব্যক্তিগত উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া আইআইটি/আইআইআইটির স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে ইসিআইনেট রিভিউ করা হবে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের সুবিধার্থে সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। এর তিন দিন পরই, অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বর, সেই নির্দেশনামা জারি করা হয়।

২৯ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে শুনানির নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি রাজ্যগুলোকে জানানো হয়েছে এবং আইটি ডিজিকে পাঠানো হয়েছে যাতে ইসিআইনেট সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়। একই সাথে দুই কমিশনারের তোলা অন্য একটি বিষয় সমাধান করা হয়েছে—ফরম ৬-এর সাথে থাকা বাড়তি ঘোষণাপত্রটি ‘কেবল এসআইআর ধাপেই ব্যবহার করা হবে।’ এসআইআর ছাড়া অন্য সময়ে ১৯৬০ সালের ‘রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস’ অনুযায়ী নির্ধারিত সাধারণ ফরম ব্যবহৃত হবে।

বৃহস্পতিবার সমস্ত রাজ্যের সিইওদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকের পর, মহারাষ্ট্র (যেখানে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আকারে এসআইআর চলছে) তাদের ইআরওদের নির্দেশ দিয়েছে যেন তাড়াহুড়ো করে কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়া হয়।

মুম্বাই সিটি ও মুম্বাই শহরতলি অঞ্চলের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো মুম্বাই সিইও অফিসের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, সংশ্লিষ্ট ভোটারকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে, শুনানি গ্রহণ করতে হবে এবং সঠিক আদেশ জারি করতে হবে।’

চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘কোনো যোগ্য ভোটার যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে যেন কোনো বাধা তৈরি না হয়।’ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন তড়িঘড়ি করে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত না নেন এবং ইআরও পর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই নিশ্চিত করেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল যে, ‘আনম্যাপড’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নোটিশ পাওয়া ভোটারদের সশরীরে শুনানিতে হাজির হতে হবে না—মহারাষ্ট্রের চিঠিটি মূলত সেই সিদ্ধান্তেরই বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে কাগজপত্র সংগ্রহ করে ইআরও-দের সিদ্ধান্তের জন্য অনলাইনে আপলোড করবেন। আর যাদের ইতিমধ্যে শুনানির নোটিশ পাঠানো হয়ে গেছে, তাদের ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে যে তাদের আসার প্রয়োজন নেই।

আগামী ৩,৪, ১০ ও ১১ অক্টোবর বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করা হচ্ছে। চিঠিতে আরও একটি সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে: বিএলও-র পরিদর্শনের পরও যদি কোনো বিষয়ের সমাধান না হয়, তবে নাম বাদ দেওয়ার আগে কাগজপত্র জমা দেওয়ার শেষ একটি সুযোগ দিতে হবে, শুনানি করতে হবে এবং লিখিত আদেশ জারি করতে হবে।

মহারাষ্ট্রের খসড়া তালিকায় ১ কোটি ২২ লাখ রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬২ লাখ ৪৮ হাজার ক্ষেত্রে আত্মীয়দের তথ্যে গরমিল ছিল এবং ৫৯ লাখ ৭৫ হাজার ক্ষেত্রে আগের তালিকার আত্মীয়দের সাথে সংযোগ মেলানো (ম্যাপ করা) যায়নি। তবে সিইওর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ইসিআইনেট ও বিএলও অ্যাপে ‘প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন’ আনার কাজ এখনো চলছে।