ভারতের পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় শহরে মেয়েদের জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস চালু করেছে ৪৭৩ বছরের পুরোনো একটি ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল। চলতি বছরের শুরুতে যাত্রা শুরু করে স্কুলটি।
স্কুলটির মূল ক্যাম্পাস ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারে। সেখানের ভবনগুলো গথিক স্থাপত্যশৈলীর হলেও ভারতের ক্যাম্পাসটি তুলনামূলক আধুনিক। এখানে বিশেষভাবে নির্মিত একাধিক ভবন রয়েছে। তবু লাল ইটের একটি নজরকাড়া ঘড়ির টাওয়ারে স্কুলটির ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করা অন্তত ছয়টি ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলের মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন বেডফোর্ড স্কুলের মোহালি ক্যাম্পাস। এসব স্কুলের মধ্যে তিনটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চীনে বাজার পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠা এবং যুক্তরাজ্যে বেসরকারি স্কুলের বেতনের ওপর ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রেক্ষাপটে ভারতে এসব স্কুলের সম্প্রসারণ ঘটছে।
২০২৩ সালে ভারতের প্রযুক্তি খাতের কেন্দ্র বেঙ্গালুরুতে যাত্রা শুরু করে হ্যারো স্কুল। শহরটি ভারতের ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে পরিচিত এবং সফটওয়্যার ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছিলেন হ্যারো স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। এদিকে মধ্য ভারতের ভোপালে ক্যাম্পাস করেছে শ্রুজবেরি স্কুল। পশ্চিম ভারতের পুনে শহরে ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে ওয়েলিংটন কলেজ। সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের কারণে পুনেকে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হয়।
মিলফিল্ড, কুইন এলিজাবেথ স্কুলসহ আরও কয়েকটি ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী কয়েক বছরে ভারতে শাখা ক্যাম্পাস চালু করতে পারে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে ঔপনিবেশিক আমলের ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত আবাসিক স্কুল রয়েছে। অভিজাত ও অভিজাত বংশের পরিবারগুলোর সন্তানদের পড়াশোনার জন্য এসব স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের নতুন ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ায় এই বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বেঙ্গালুরুতে হ্যারো স্কুলের প্রধান ক্যারোলিন পাসকো বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম অনেক পরিবারের জন্য বড় আকর্ষণ।’
ভারতে হ্যারো ও বেডফোর্ড এমন কয়েকটি স্কুলের মধ্যে রয়েছে, যেগুলো প্রাথমিক স্তর থেকে এ-লেভেল পর্যন্ত পুরো শিক্ষাজীবনে কেমব্রিজের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। বিশ্বব্যাপী ১০ হাজার স্কুলে স্বীকৃত এই শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক শিক্ষাকাঠামো হিসেবে পরিচিত।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলকাঠামো নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের হরসিমরন সিং কোচর তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে পরনীতকে বেডফোর্ড স্কুলের মোহালি ক্যাম্পাসে ভর্তি করিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, স্কুলটির ‘শিশুর চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং শুধু পড়াশোনার বাইরেও সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি’ তাঁকে আকৃষ্ট করেছে।
ভারতের অনেক স্কুলের মতো এখানে ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ নেই—এ বিষয়টিও তাঁকে আকৃষ্ট করেছে বলে জানান তিনি। সিং বলেন, ‘সব শিশুর সঙ্গে একই রকম আচরণ করা হয়। মন্ত্রী ও আমলাদের সন্তানেরা বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পায় না।’
ভারতের সচ্ছল পরিবারগুলোর পাশাপাশি অনাবাসী ভারতীয়রাও এসব স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে আসা পরিবার কিংবা যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত যেসব অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চান, তাঁরাও এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী বলে জানান পাসকো।
বেঙ্গালুরুতে হ্যারো স্কুলের ৬০ শতাংশ কর্মীই আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া। অন্য ব্রিটিশ স্কুলগুলোর মতো তারাও নিজেদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ভারতের ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছে। এখানে শিক্ষকদের ‘বিকস’ নামে ডাকা হয়। শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী হ্যারো টুপি ও পোশাক পরে।
এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আয়োজিত আন্তদেশীয় দৌড় প্রতিযোগিতা ‘দ্য লং ডাকারে’ অংশ নেয় তারা। স্কুলটিতে রয়েছে ‘হাউস’ পদ্ধতি, যা ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ব্রিটিশ স্কুলের নিজস্ব ঐতিহ্য ও কিছুটা স্থানীয় পরিসরকেন্দ্রিক রীতিনীতির সঙ্গে ভারতের সংস্কৃতিও মিশেছে। যেমন প্রতিদিন সকালে ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় এবং বড় হিন্দু উৎসব গণেশ চতুর্থী উদযাপন করা হয়।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও নব্য ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে এই সম্প্রসারণের পেছনে চীনের বাজারে গতি কমে আসারও ভূমিকা রয়েছে।
গত এক দশকে বিদেশে ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলগুলোর সম্প্রসারণের বড় অংশই ঘটেছে চীন ও হংকংয়ে। যুক্তরাজ্যের ৫০টি স্কুলের পরিচালিত ১৫১টি শাখা ক্যাম্পাসের প্রায় অর্ধেকই এই দুই অঞ্চলে অবস্থিত।
তবে নিয়ন্ত্রণবিধিতে পরিবর্তনের কারণে সেখানে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট এডুকেশন পলিসি ফোরামের (পিইপিএফ) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের সরকারের বাড়তি নজরদারি এবং এমনকি প্রতিরোধের মুখেও পড়ছে এসব স্কুল।
চীনে ২০২৪ সালে প্রণীত নতুন একটি আইনে সব বিষয়ে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এতে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি পরিকল্পিত কিছু ক্যাম্পাস বাতিলও করতে হয়। ফলে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে জানিয়েছে পিইপিএফ।
এদিকে যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৪ সালের শরৎকালীন বাজেটে বেসরকারি স্কুলের বেতনের ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। বেডফোর্ড স্কুলের মোহালি ক্যাম্পাসের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নাওমি অ্যাটকিনস বলেন, এর ফলে অনেক বেসরকারি স্কুল বিদেশে সম্প্রসারণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে।
অ্যাটকিনস বিবিসিকে বলেন, ‘তারা খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। আগে যারা কখনো আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের কথা ভাবেনি, তারাও এখন হঠাৎ করে ভারতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’
তবে তাঁর মতে, ভারতের বাজারে প্রবেশ করা সহজ নয়। এসব স্কুলের অধিকাংশই স্থানীয় বিনিয়োগকারী বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।
মোহালি ক্যাম্পাসের প্রতিষ্ঠাতা আরও জানান, আগে অন্য দেশে স্থানীয় অংশীদারকে দেওয়া ফি বা রাজস্বের অংশ হিসেবে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নির্ধারণ করে চুক্তি করা সম্ভব হতো। কিন্তু ভারতে কিছু ক্ষেত্রে এই মুনাফার হার কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভারতের বাজারের আকার নিয়েও কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত আশাবাদী ছিল বলে মনে করেন অ্যাটকিনসন।
ভারতে প্রায় ২৫ কোটি শিশু স্কুলে পড়াশোনা করলেও দেশটিতে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। ফলে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মতো অ-ইংরেজিভাষী দেশগুলোর তুলনায় স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।
এ ছাড়া ভারতের মাথাপিছু আয় তুলনামূলকভাবে কম। ব্রিটিশ স্কুলগুলোর উচ্চ বেতনও সম্প্রসারণের পথে বাধা। এসব স্কুলে পূর্ণ আবাসিক শিক্ষার জন্য বছরে ১৫ হাজার পাউন্ড বা তারও বেশি ফি নেওয়া হতে পারে।
মোহালি ক্যাম্পাসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাটকিনস বলেন, ‘আমি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীনে কাজ করেছি। কিন্তু ভারতীয়রা দামের ব্যাপারে অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাঁরা সাশ্রয়ী দামে ভালো কিছু পেতে চান।’
এ কারণেই বেডফোর্ড স্কুলের মোহালি ক্যাম্পাসে অন্য ব্রিটিশ স্কুলগুলোর তুলনায় প্রায় অর্ধেক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। পিইপিএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে বিদেশে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর শাখা ক্যাম্পাস থেকে ১৫ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ড মুনাফা হয়েছে। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই মুনাফার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের গতি দ্রুত ও ব্যাপক হওয়ার বদলে ধীরস্থির হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির ঔপনিবেশিক অতীতের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নতুন ধনী পরিবারগুলোর চাহিদা এসব স্কুলের জন্য বড় ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে চীনের বাজার হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো বড় বাজার ভারত হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।