ভারতে চলমান বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা ও ডিজিটাল নজরদারির অভিযোগ উঠেছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্বাধীন তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের প্রায় দুই ডজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বলেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকে আহত হয়েছেন এবং কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিগ্রহের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হওয়া সত্ত্বেও নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে হাজারো মানুষকে বিক্ষোভে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। বিবৃতিতে তাঁরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সমাবেশের ওপর আরোপ করা সার্বিক নিষেধাজ্ঞা, বায়োমেট্রিকসহ ডিজিটাল নজরদারির ব্যবহার ও ইন্টারনেট বন্ধের মতো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সম্প্রতি ভারতে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন বিক্ষোভ করছে। বিক্ষোভকারী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যোগ্য ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁদের। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমনভাবে এসব পরিবর্তন করা হচ্ছে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপিকে বিশেষ সুবিধা দেবে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, গৃহহীন, মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কম হওয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট।
তবে বিজেপি ও ভারতের নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে যেসব নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ছিল একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটার, মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তি ও বিভিন্ন কারণে ভোট দেওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিরা। ভুল করে কারও নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপিলের মাধ্যমে তা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন বলেও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীরা আহত হয়েছেন কি না, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার হয়েছে কি না ও বলপ্রয়োগের মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিক্ষোভ দমনের ক্ষেত্রে সমাবেশের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমাবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে নজরদারি ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিক্ষোভকারীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবাধিকারভিত্তিক সীমা মেনে চলা উচিত।
তবে ভারত জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে গণহারে আটকের ঘটনায় চলতি মাসের শুরুতেও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবে ভারত তখনো এতে আপত্তি জানায়।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করেছিল বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পাশাপাশি চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। এ বিক্ষোভের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বিক্ষোভ দমনে ভারতের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘের নিজস্ব কর্মকর্তা নন। তাঁরা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, যাঁদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করা। ফলে তাঁদের বক্তব্য জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা সংগঠনটির সম্মিলিত অবস্থান নয়।