হোম > বিশ্ব > ভারত

ধর্ষণ ও সিইসি বিতর্কে দিল্লি উত্তাল, এর মধ্যেই ‘ভজন ক্লাবিং’-এ মোদি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় পার্কে ‘ভজন ক্লাবিং’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স

ভারতের রাজধানী দিল্লি যখন একদিকে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে, অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে—ঠিক সেই সময়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ‘ভজন ক্লাবিং’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভজনের তালে তালে খঞ্জনি বাজানো ও তরুণদের সঙ্গে গাইতে দেখা যায় মোদিকে। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আয়োজনকে ঘিরে নানান আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি দল বিজেপি এটিকে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করলেও, বিরোধীরা এর সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

গতকাল শুক্রবার রাতে দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় পার্কে ভারতীয় জনসংঘের নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ১১০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ‘ভজন ক্লাবিং’ অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত হয়ে তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে ভজন পরিবেশনা উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায়, গেরুয়া পোশাক পরা তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে তিনি হাততালি দিচ্ছেন এবং খঞ্জনি বাজিয়ে সুরে তাল মেলাচ্ছেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুষ্ঠানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন। একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভিডিওটি দেখে কি আপনিও তালে তালে পা নাড়িয়েছেন?’ তাঁর এই পোস্ট দ্রুতই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

কী এই ‘ভজন ক্লাবিং’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের জেন জি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক ধারা হলো ‘ভজন ক্লাবিং’। এতে প্রচলিত ভজন বা ভক্তিমূলক সংগীতকে আধুনিক সাউন্ড, আলো ও সমবেত পরিবেশনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, এটি আধ্যাত্মিকতা ও সমসাময়িক তরুণ সংস্কৃতির একটি নতুন সংমিশ্রণ।

বিজেপি এই উদ্যোগকে ‘সংস্কৃতি, ভক্তি ও নতুন প্রজন্মের শক্তির মিলন’ হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির নেতারা বলছেন, তরুণদের কাছে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি নতুন মাধ্যম। প্রধানমন্ত্রীও অতীতে এই প্রবণতাকে ভক্তি, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও আধুনিকতার সমন্বয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রাজনীতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী।

দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় পার্কে ‘ভজন ক্লাবিং’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে প্রধানমন্ত্রীর পোস্টের জবাবে এক শব্দে লেখেন, ‘Priorities’ (অগ্রাধিকার)। সেই মন্তব্যের সঙ্গে তিনি দিল্লির এক পার্কে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের একটি সংবাদ শেয়ার করেন। তাঁর মন্তব্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো প্রতিক্রিয়া জমা পড়ে।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও অনেকে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন। একজন লেখেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রীকে ভজন ক্লাবিং করতে দেখলাম।’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘যখন মোদি চাপে পড়েন, তখন ভজন ক্লাবিং করেন।’

মোদির অনুষ্ঠানের আগে দিল্লিতে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। দক্ষিণ দিল্লির একটি পার্কে পুলিশের পরিচয় দিয়ে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় রাজধানীজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

লেডি শ্রী রাম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে লেডি শ্রী রাম কলেজ সাময়িকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্তও নেয়।

এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এমন একটি সংকটময় সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কতটা উপযুক্ত ছিল।

একই সময়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনও বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে। এসআইআর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন চলছে।

গতকাল শুক্রবার কংগ্রেস বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। পাশাপাশি দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আরও আন্দোলনের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো।

ফলে দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নারী নিরাপত্তা ও নির্বাচন কমিশন—দুটি বড় ইস্যু একসঙ্গে আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থকেরা বলছেন, ‘ভজন ক্লাবিং’কে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। মোদি সমর্থক এক ব্যবহারকারী এক্সে লিখেছেন, কয়েক বছর আগে জেন জিদের মধ্যে এই ধারা শুরু হয়েছে। এটি মদ্যপাননির্ভর পশ্চিমা ক্লাব সংস্কৃতির একটি বিকল্প, যা আরও শান্ত, নান্দনিক এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিফলন।

বিজেপির নেতারাও দাবি করছেন, এই অনুষ্ঠান তরুণদের কাছে ভক্তিমূলক সংগীতকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্টভাবেই দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক পক্ষ এটিকে সংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপন হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষের মতে, চলমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই উপস্থিতি জনমনে অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া