ভারতে চলমান ভোটার তালিকা বিতর্ক এবং নির্বাচন কমিশন-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা ‘তেলাপোকা’ (ককরোচ) প্রতীক নিয়ে এবার মুখ খুললেন প্রখ্যাত লেখক সালমান রুশদি এবং খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা মিরা নায়ার।
নিউইয়র্কে একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে রুশদি ভারতের তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করে তাঁদের ভারতের জন্য দীর্ঘদিনের মধ্যে ‘সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে মিরা নায়ার নিজেকে ‘ককরোচ মম’ (তেলাপোকা মা) হিসেবে আখ্যা দিয়ে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইরত তরুণদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শাসকদল সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদীরা তাঁদের ভারত এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরোধী বলে অভিযুক্ত করছেন। বিপরীতে অন্য বিশ্লেষকেরা রুশদির এই মন্তব্যের পর হিন্দুত্ববাদীদের দ্বৈত আচরণের কথা তুলে ধরছেন।
নিউইয়র্কে ‘এশিয়ান আমেরিকান রাইটার্স ওয়ার্কশপ’-এর এক তহবিল সংগ্রহ ও প্রাক-দিওয়ালি নৈশভোজে এই মন্তব্য করে দুই প্রখ্যাত ভারতীয়। লেখক অমিতাভ কুমার তাঁর সাবস্ট্যাক পেজে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, অনুষ্ঠানটিতে মিরা নায়ারের জন্মদিনও উদ্যাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সালমান রুশদি বলেন, ‘বর্তমানে ভারতে একটা কিছু ঘটছে। ভারত ফুটছে। কোনো রেস্তোরাঁয় দাঁড়িয়ে হয়তো এটা বলা ঠিক নয়, তবুও “তেলাপোকা” প্রতীককে সেলিব্রেট না করলে ভুল হবে। ভারতের তরুণ সমাজ আমাদের দীর্ঘ সময় পর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক এক মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।’
একই অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা মিরা নায়ারও ভারতের গণতন্ত্র রক্ষায় সোচ্চার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁদের প্রতি গর্ব প্রকাশ করেন এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেন।
অনলাইনে রুশদি ও মিরা নায়ারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ‘দ্য ফ্রি প্রেস’-এর সিনিয়র রাইটার রুপা সুব্রহ্মণ্য লিখেছেন, ভারতীয় আন্দোলনকারীদের দাবি যুক্তিসংগত হতে পারে এবং তাঁদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে। তবে রুশদি ও মিরা নায়ারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, দুজনেই এমন এক ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ভারতীয় অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যারা দীর্ঘ দিন ধরে নরেন্দ্র মোদীকে অবজ্ঞার চোখে দেখে আসছেন।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ রুপা লেখেন, ‘বিষয়টি হয়তো খুব একটা আশ্চর্যের নয়, কারণ তাঁরা দুজনেই সেই উচ্চবিত্ত ও ইংরেজি মাধ্যমীয় অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি, যারা দীর্ঘ দিন ধরে মোদীকে কটাক্ষ করে আসছে।’ তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাস প্রকাশের পর থেকে রুশদি কীভাবে চরমপন্থীদের হুমকির মুখে পড়েছিলেন এবং ২০২২ সালে নিউইয়র্কে কীভাবে হামলার শিকার হয়েছিলেন।
অন্য একাধিক ব্যবহারকারী রুশদি এবং মিরা নায়ারের কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ তোলেন যে তাঁরা ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন। এক নেটিজেন দাবি করেন, রুশদি ভারতের বিনাশ চান, অথচ সাধারণ ভারতীয়রা সব সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তবে বিপরীত সুরও শোনা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এক স্বাধীন সাংবাদিক ‘এক্স’-এ উল্লেখ করেন, দশকের পর দশক ধরে হিন্দু ডানপন্থীরা সালমান রুশদিকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছেন কারণ তিনি ইসলামি চরমপন্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আজ যখন তিনি হিন্দু চরমপন্থা বা মোদী সরকারের সমালোচনা করছেন, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তাঁরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছেন।
তিনি লেখেন, ‘হিন্দু ডানপন্থীরা এত দিন ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের জন্য রুশদিকে মাথায় তুলে রেখেছিল। এখন যখন তিনি তাঁদের ভাবধারার সমালোচনা করছেন, তখন তাঁদের আর পাল্টা কিছু বলার মুখ থাকছে না।’
দিল্লির কনট প্লেসে সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর প্রতিবাদ মিছিলকে কেন্দ্র করে এই ‘তেলাপোকা’ প্রতীকটি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিউইয়র্কের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার আলোয় নিয়ে এলো।