পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পর বেশ কয়েক দিন ধরে পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে রাজভবনেও যাননি তিনি। তবে আজ শনিবার সকালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পরপরই নীরবে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলের ‘বায়ো’ বা প্রোফাইল পরিবর্তন করেছেন মমতা। তাঁর এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশেষে তাঁর ‘পরাজয় স্বীকার’ করে নেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত মমতার এক্স প্রোফাইলে লেখা ছিল ‘অনারেবল চিফ মিনিস্টার, ওয়েস্ট বেঙ্গল’ (পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী)। তবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণের ঠিক পরপরই তিনি তাঁর বায়ো পরিবর্তন করেন। সেখানে ‘প্রাক্তন’ বা ‘সাবেক’ শব্দটি এড়িয়ে লিখেছেন—‘চিফ মিনিস্টার অব ওয়েস্ট বেঙ্গল (১৫তম, ১৬তম ও ১৭তম বিধানসভা)’। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ভেঙে নিজের গড়ে তোলা দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন হিসেবেও নিজেকে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এদিকে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও মমতার এক্স বায়ো পরিবর্তন না করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক ব্যবহারকারী এক্স কর্তৃপক্ষ এবং এর মালিক ইলন মাস্ককে ট্যাগ করে মমতার প্রোফাইল পরিবর্তনের দাবি জানান, এমনকি তাঁর অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবিও ওঠে।
ভারতীয় এক সাংবাদিক এক্সে লিখেছেন, সরাসরি ‘প্রাক্তন’ শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে তিনি ১৫তম, ১৬তম ও ১৭তম বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রী লেখার মাধ্যমে বেশ চতুর রাজনৈতিক চাল চেলেছেন।
তবে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মমতা অবশেষে ক্ষমতার পালাবদলকে মেনে নিলেন। ৭ মে রাজ্যপাল আরএন রবি পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে পূর্বতন বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই মূলত সাংবিধানিকভাবে মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটেছিল।
এবারের নির্বাচনে গতবারের ২১৫টি আসনের বিপরীতে তৃণমূলের আসনসংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮০টিতে। অন্যদিকে গতবার ৭৭টি আসন পাওয়া বিজেপি এবার ২০৭টি আসন জিতে এক ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে।
কেন পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন মমতা
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল সুপ্রিমো ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরদিন (৫ মে) পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, নৈতিকভাবে এই নির্বাচনে তৃণমূলই জয়ী হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ এনেছিলেন।
মমতা বলেছিলেন, ‘আমি যদি সত্যিই হারতাম, তবে পদত্যাগ করতাম। কেউ যদি ভেবে থাকেন চাপের মুখে আমি পদ ছেড়ে দেব, তবে তা ভুল। আমরা এই নির্বাচনে হারিনি, নৈতিক জয় আমাদেরই হয়েছে।’
মমতার পরবর্তী পরিকল্পনা কী
ক্ষমতা হারানোর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি পুনরায় তাঁর চেনা রূপ; অর্থাৎ ‘রাস্তায় লড়াই করা’ বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অতীতে এই ‘স্ট্রিট ফাইটার’ ভাবমূর্তি ব্যবহার করেই তিনি বাম ফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।
৫ মে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এখন খাঁচামুক্ত পাখি। একসময় আমি রাস্তাতেই ছিলাম, আবারও রাস্তাতেই ফিরে যাব।’
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপির সরকার গঠনের পর মমতা যে আবারও তাঁর চিরপরিচিত আন্দোলনের চেনা মাঠে ফিরতে যাচ্ছেন, তা এই বার্তার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।