৪ মে ভোট গণনার ঠিক আগমুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) একাধারে রাজনৈতিক, আইনি ও প্রশাসনিক নানা জটিলতার মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই ইভিএম বা ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ তুলে গতকাল গভীর রাতে একটি ভোট গণনা কেন্দ্রে হঠাৎ মমতার উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
এর আগে গত বুধবার একাধিক বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোলে বিজেপি এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দেওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা ম্যাট্রিজের পূর্বাভাসে বিজেপিকে ১৪৬-১৬১ এবং তৃণমূলকে ১২৫-১৪০ আসন দেওয়া হয়েছে। পি-মার্ক বিজেপিকে ১৫০-১৭৫ এবং তৃণমূলকে ১১৮-১৩৮ আসন পাওয়ার কথা জানিয়েছে। পোল ডায়েরি বিজেপিকে ১৪২-১৭১ এবং তৃণমূলকে ৯৯-১২৭ আসনের পূর্বাভাস দিয়েছে।
তবে ব্যতিক্রমী হিসেবে পিপলস পালস তৃণমূলকে ১৭৭-১৮৭ আসনে জয়ী এবং বিজেপিকে ৯৫-১১০ আসনে আটকে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে।
এই পূর্বাভাসগুলোকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এগুলোকে ‘মনগড়া’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভোট গণনার আগে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিতে এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার অংশ।
এদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আইনি ক্ষেত্রেও তৃণমূল কিছুটা কোণঠাসা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট গণনার দুটি প্রক্রিয়ার বিষয়ে তৃণমূলের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। প্রথম আবেদনে গণনার সুপারভাইজার বা সহকারী হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার বা পিএসইউ কর্মীদের নিয়োগের নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়। আদালত সেই আবেদনে কোনো ‘মেরিট’ বা গুরুত্ব খুঁজে পাননি এবং বলেছেন, ভোট গণনার সুপারভাইজার নিয়োগে কোনো বৈষম্য করা হয়নি।
অন্য একটি আবেদনে তৃণমূল বিধায়ক জাভেদ খান ভোট গণনা কেন্দ্র স্থানান্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আদালত রায় দিয়েছেন, গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম থেকে বিহারীলাল কলেজে গণনা কেন্দ্র স্থানান্তর করায় কোনো বেআইনি কাজ হয়নি।
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে গতকাল গভীর রাতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরের সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ইভিএম কক্ষে পৌঁছান এবং প্রায় চার ঘণ্টা ভেতরে অবস্থান করেন। মধ্যরাতের কিছু পরই তিনি সেখান থেকে বের হন। প্রার্থী হিসেবে সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথমে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বাধার মুখে পড়লেও পরে তাঁকে নির্ধারিত এলাকা পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
মমতা জানান, ইভিএম কারচুপির দৃশ্য দেখে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি সেখানে ছুটে গেছেন। তিনি বলেন, ‘ভোট গণনায় কারচুপির চেষ্টা করা হলে তা বরদাশত করা হবে না।’
এর আগে ওই দিন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ এবং শশী পাঁজা খুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে ইভিএম কক্ষের বাইরে অনশনে বসেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজে ‘অননুমোদিত ব্যক্তিদের’ ব্যালট পেপার নাড়াচাড়া করতে দেখা গেছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটেজটি পোস্ট করে এটিকে ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ বলে দাবি করা হয়েছে।
কুণাল ঘোষ দাবি করেন, কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই ইভিএম কক্ষ খোলা হয়েছিল এবং কেন দলের প্রতিনিধিদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হলো না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি সদস্যদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যালট পেপার সরানো হচ্ছে।
তৃণমূলের এসব অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। তাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তৃণমূলকে ‘সংবেদনশীল’ এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য পাল্টা অভিযুক্ত করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। ভবানীপুরে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা যাতে কেউ না নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য তাঁর এজেন্টরা সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর এই কর্মকাণ্ড ‘পরাজয় স্বীকারের’ শামিল।
এদিকে তৃণমূলের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের আবহে নির্বাচন কমিশন সমস্ত জালিয়াতির দাবি খারিজ করে দিয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, সব ইভিএম কক্ষে প্রার্থী ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে সিল করা হয়েছে এবং সেগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভাইরাল ভিডিওতে যে কার্যক্রম দেখা গেছে, তা ছিল অন্য একটি ইভিএম কক্ষে পোস্টাল ব্যালট বিন্যাসের অনুমোদিত অংশ, ইভিএম কারচুপি নয়। তাঁরা আরও জানান, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে সব রাজনৈতিক দলকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া চলাকালে তাঁরা হাজার হাজার অভিযোগ পেয়েছেন এবং সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে; প্রয়োজনে পুনর্নির্বাচনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।