ইউরোপে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ড ও হামলা চালাতে ক্রমেই বেশি করে কিশোরদের ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া এসব কিশোরকে অনেক সময় কম্পিউটার গেমের মতো ‘মিশন’ দিয়ে হত্যাকাণ্ডে পাঠানো হচ্ছে। ইউরোপীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষায়, এটি ‘ভায়োলেন্স অ্যাজ এ সার্ভিস’ বা অর্থের বিনিময়ে সহিংসতা পরিচালনার এক নতুন ও ভয়ংকর ধারা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—সুইডেনভিত্তিক ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক এর অন্যতম উদাহরণ। গত কয়েক বছরে এই সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে কয়েকটি হামলা ও হামলার চেষ্টার সঙ্গেও গোষ্ঠীটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এসব হামলার মধ্যে বিস্ফোরক ও হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহারের ঘটনাও রয়েছে।
একটি ঘটনায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্টকহোমের একটি উপশহরে ১৮ বছর বয়সী আতিলা আজিমভ ২০ বছর বয়সী মুরাদ আবদেলকাদেরকে গুলি করে হত্যা করেন। কিন্তু পরে জানা যায়, আজিমভ ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডটি চালিয়েছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে। বর্তমানে ভুল ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে আজিমভ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ইউরোপীয় পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ ‘অপারেশনাল টাস্কফোর্স গ্রিম’ জানিয়েছে, কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়োগ করা হচ্ছে। তাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয় এমনভাবে, যেন তারা কোনো কম্পিউটার গেমের চরিত্র। ইউরোপোলের ইউরোপিয়ান সিরিয়াস অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম সেন্টারের প্রধান অ্যান্ডি ক্র্যাগ এই প্রবণতাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের কাছে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব আউটসোর্স করা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বর্তমানে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য—১১টি দেশ ‘অপারেশনাল টাস্কফোর্স গ্রিম’-এর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতা রাওয়া মাজিদ বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়। সুইডিশ তদন্তকারীরা জানিয়েছে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীদের বিরুদ্ধেও কিছু হামলায় ফক্সট্রটকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ইরানের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং ইসরায়েলি স্থাপনা তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের অংশ হিসেবেও ফক্সট্রটের অনেক হামলা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্য সরকার ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক ও মাজিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
কিশোরদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড পরিচালনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে নরওয়ের কিশোর জোহানেস ন্যাটল্যান্ডের মামলায়। ১৮ বছর বয়সে ন্যাটল্যান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হত্যাকাণ্ড চালানোর প্রস্তাব পান। ইংল্যান্ডে একজনকে হত্যা করতে পারলে তাকে ২ লাখ ৭০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোনার (প্রায় ৩৫ লাখ টাকা) পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ন্যাটল্যান্ডকে নিয়োগ করে অনলাইনে ‘Generalen’ নামে পরিচিত ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর।
ন্যাটল্যান্ডকে নিয়োগের পর তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত ‘Agent 47’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি। জনপ্রিয় ‘Hitman’ ভিডিও গেমের মূল চরিত্রের নাম অনুসারে এই ছদ্মনামটি ব্যবহার করা হয়। সুইডিশ পুলিশ মনে করে, এই ব্যক্তি হলেন আলি শাহেদ আহমেদ, যিনি ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতা রাওয়া মাজিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। মিশন সফল করার জন্য ন্যাটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের বিমানের টিকিট, জরুরি পাসপোর্ট এবং যাত্রাপথের নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহেদের বিরুদ্ধে। ‘সিগনাল’ মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ন্যাটল্যান্ডকে পুরো যাত্রাপথে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে তাকে আরেক সহযোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই ব্যক্তি ন্যাটল্যান্ডকে হাডার্সফিল্ডের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের অবস্থান দেখাতে মানচিত্র ও ভিডিও পাঠায়। তদন্তকারীদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছিল যেন একজন কিশোরকে কোনো কম্পিউটার গেমের চরিত্র হিসেবে একটি ‘মিশন’ সম্পন্ন করতে পাঠানো হচ্ছে।
আলি শাহেদ আহমেদকে ২০২৫ সালে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের সুলাইমানিয়াহ শহর থেকে আটক করা হয়। তাকে শিগগিরই সুইডেনে প্রত্যর্পণ করা হতে পারে।
তদন্তকারীরা বলছেন—এই নেটওয়ার্কগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই কম বয়সী কিশোরদের বেছে নেয়। কারণ তারা ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী এবং গ্রেপ্তারের পর তাদের পারিশ্রমিকও দিতে হয় না। সুইডিশ সাংবাদিক দিয়ামান্ত সালিহুর মতে, গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের কেউই হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রতিশ্রুত অর্থ পায়নি।
ইউরোপীয় পুলিশের অভিযানে গত ১৫ মাসে ২৮০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। ফক্সট্রটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের কয়েকজনও ধরা পড়েছেন। তবে মাজিদ এখনো ইরানে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফক্সট্রটের প্রতিদ্বন্দ্বী ডালেন নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীও একই কৌশলে কিশোরদের নিয়োগ শুরু করেছে।
ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছু সাফল্য এলেও ইউরোপে ‘ভাড়াটে কিশোর খুনি’ ব্যবস্থার বিস্তার এখনো বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।