রাশিয়ার রাতভর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হামলায় শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, অবকাঠামো ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো বলেন, হামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ আবারও ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে।’
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একটি ‘বড়’ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপরই কিয়েভজুড়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং কয়েকটি পাড়ার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে দিনের আলো ফুটলে বিস্ফোরণের আঘাতে সৃষ্ট বলে ধারণা করা একটি বড় গর্ত দেখা যায়। ধ্বংসস্তূপের পাশে আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এবং অবকাঠামোর চিত্রও সামনে আসে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে অন্তত একজন গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া শহরের একটি কেন্দ্রীয় সড়কে অবস্থিত একটি হোটেলে আগুন ধরে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকর্মীরা কাজ করেন। রাতভর কিয়েভের আকাশে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ট্রেসার ফায়ারের আলো দেখা যায়। একই সঙ্গে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলগা স্তেফানিশিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেন, ‘শহরের বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল আরেকটি বিভীষিকাময় রাত। তাঁদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাতে বাধ্য হতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, শহরের বিভিন্ন জেলায় বেসামরিক অবকাঠামো ও আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পর ইউক্রেনে এটি রাশিয়ার প্রথম বড় পরিসরের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। বুধবার জেলেনস্কি আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরেন। তিনি বলেন, নতুন গোয়েন্দা তথ্য থেকে জানা গেছে, মস্কো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের জনগণকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। নিজেদের, নিজেদের সন্তানদের এবং অবশ্যই নিজেদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।’
জেলেনস্কি আরও বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘বেশ কিছু সময় ধরেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এই ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’
এদিকে, নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে পোল্যান্ড যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। দেশটি এ পদক্ষেপকে ‘প্রতিরোধমূলক’ ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনী এক্সে এক পোস্টে জানায়, ‘এসব পদক্ষেপ প্রতিরোধমূলক। এর উদ্দেশ্য আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখা এবং নিরাপদ রাখা, বিশেষ করে হুমকির মুখে থাকা অঞ্চলের সংলগ্ন এলাকাগুলোতে।’
পোল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। জোটের অনুচ্ছেদ-৫ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অপরদিকে, সম্প্রতি রুশ সেনারা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের শহর কোস্তিয়ানতিনিভকার দিকে অগ্রসর হয়েছে। শহরটি পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোর একটি। মস্কো শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে পুরো দনবাস অঞ্চলে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তাদের জন্য উন্মুক্ত হবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডাররা দাবি করেছেন, চলতি বছরে তাঁরা যতটা ভূখণ্ড হারিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি এলাকা পুনর্দখল করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা রাশিয়ার সীমান্ত থেকে অধিকৃত ক্রিমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহ লাইনেও বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। উভয় পক্ষের সেনারা মূলত নিজ নিজ অবস্থানে শক্তভাবে অবস্থান নিয়ে আছে।
বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর বেশির ভাগই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই দখল করা হয়েছিল।