বসনিয়ার সার্ব বাহিনীর সাবেক কমান্ডার এবং ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত যুদ্ধাপরাধী র্যাটকো ম্লাদিচ ৮৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে পড়ার সময় বসনিয়ায় সংঘটিত জাতিগত নিধন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী ছিলেন তিনি।
বসনিয়ান সার্ব সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ম্লাদিচ এমন এক নৃশংস সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত শুদ্ধি অভিযান। বাস্তবে এর অর্থ ছিল বসনিয়ার মুসলিম বা বসনিয়াক জনগোষ্ঠীকে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বন্দিশিবিরে আটক এবং জোরপূর্বক বিতাড়ন করা। তার লক্ষ্য ছিল তথাকথিত ‘গ্রেটার সার্বিয়া’ প্রতিষ্ঠা।
১৯৪২ সালের ১২ মার্চ সারায়েভোর কাছে একটি পাহাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ম্লাদিচ। তখন অঞ্চলটি নাৎসি জার্মানির নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ ছিল। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। তার বাবা জোসিপ ব্রোজ টিটোর নেতৃত্বাধীন পার্টিজান বাহিনীর হয়ে নাৎসি-সমর্থিত ক্রোয়াট জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিহত হন।
যুদ্ধ-পরবর্তী যুগোস্লাভিয়ায় বেড়ে ওঠা ম্লাদিচ প্রথমে টিনস্মিথ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও পরে সামরিক পেশা বেছে নেন। ১৯৬৫ সালে অফিসার স্কুল থেকে স্নাতক হওয়ার পর দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ম্যাসিডোনিয়া ও কসোভোতে সেনা ইউনিট পরিচালনা করেন।
১৯৮০ সালে যুগোস্লাভ নেতা টিটোর মৃত্যুর পর দেশটিতে জাতীয়তাবাদী বিভাজন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করলে যুগোস্লাভ সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে সেখানে পাঠানো হয় ম্লাদিচকে। পরে যুদ্ধ বসনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি বসনিয়ান সার্বদের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্র রিপাবলিকা সার্পস্কার পক্ষে অবস্থান নেন।
ম্লাদিচ বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঐতিহাসিকভাবে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দেখতেন। এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকেই তিনি একটি জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ সার্ব রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম ভয়ংকর অধ্যায় ছিল বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো অবরোধ।
ম্লাদিচের বাহিনী চারদিকের পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে সারায়েভোকে অবরুদ্ধ করে রাখে ১ হাজার ৪২৫ দিন। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এটি দীর্ঘতম নগর অবরোধগুলোর একটি। শহরটিতে নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও স্নাইপার হামলায় প্রায় ১৩ হাজার মানুষ নিহত হন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় শহরের অসংখ্য ভবন।
তবে ম্লাদিচের নাম ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার সঙ্গে। পূর্ব বসনিয়ার ছোট পাহাড়ি শহরটি তখন জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকা’ ছিল। সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল হাজার হাজার বসনিয়ার বেসামরিক নাগরিক।
বসনিয়ান সার্ব বাহিনী শহরটি দখল করার পর ম্লাদিচ নিজে সেখানে প্রবেশ করেন। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি শিশুদের মিষ্টি বিতরণ করেন এবং আশ্বাস দেন, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি। কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোরকে পরিবার থেকে আলাদা করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের অনেককে হাত বাঁধা ও চোখ বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের বয়স ছিল কিশোর থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত। পরে তাদের গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়।
এই হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতির মধ্যেই এত বড় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ম্লাদিচের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সন্ধানদাতার জন্য ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু সার্বিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের আশ্রয়ে তিনি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়ান।
স্লোবোদান মিলোশেভিচ ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার হওয়ার পর ম্লাদিচের নিরাপদ আশ্রয় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। প্রায় এক দশক তিনি বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আত্মগোপন করে থাকেন। ২০১১ সালে সার্ব নিরাপত্তা বাহিনী তাকে একটি প্রত্যন্ত খামারবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।
দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার চার বছর ধরে চলে। পাঁচ শতাধিক দিনের শুনানিতে প্রায় ৬০০ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় এবং হাজার হাজার প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ম্লাদিচ গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধের আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে রায় ঘোষণার সময়ও তিনি অনুতাপ প্রকাশ না করে অভিযোগগুলোকে ‘সব মিথ্যা’ বলে চিৎকার করেছিলেন।
কারাগার থেকেই জীবনের শেষ বছরগুলো কাটান ম্লাদিচ। অসুস্থতার কারণে সার্বিয়ায় ফিরে যাওয়ার আবেদন করলেও আন্তর্জাতিক আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে। হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও তার মুক্তির আবেদনগুলো সফল হয়নি।
ম্লাদিচের মৃত্যু হলেও বসনিয়ার যুদ্ধের ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকায়নি। বসনিয়ার মুসলিম ও সার্ব জনগোষ্ঠী এখনো একই ভূখণ্ডে বসবাস করলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েই গেছে।
কারও কাছে ম্লাদিচ সার্ব জাতীয়তাবাদের প্রতীক ও ‘রক্ষক’; কিন্তু বসনিয়াকদের কাছে তিনি গণহত্যার অন্যতম প্রধান মুখ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে তিনি সেই ব্যক্তি, যার নেতৃত্বে ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর সাক্ষী হয়েছিল।