হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

আরও ২৭ বিলিয়ন ডলার চায় ইউক্রেন, ইউরোপের প্রশ্ন—কেন?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের চলতি বছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে ২৭ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ঘাটতি পূরণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে কিয়েভ। গত মাসে ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিয়েভ সফর করা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ অর্থের প্রয়োজনের কথা জানান।

চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি ঋণ চূড়ান্ত করে ইইউ। দুই বছরে ওই অর্থ দেওয়ার কথা। এর অর্ধেক ২০২৬ সালে এবং বাকি অর্ধেক ২০২৭ সালে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই ইউক্রেন বড় ধরনের প্রতিরক্ষা বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে।

ইউক্রেনের এই অর্থ চাওয়ার বিষয়টি ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বিস্মিত করেছে। একই সময়ে রাশিয়ার ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে রয়েছে। ২০২২ সালের পর দেশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন।

চারজন ইউরোপীয় কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে ইউক্রেন অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে রয়েছে। তবে এত বড় বাজেট ঘাটতি তৈরি হবে বলে তারা আশা করেনি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

ইউরোপের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত আলোচনায় কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, ইউক্রেনের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং দেশটি তার প্রয়োজনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখাচ্ছে কি না? বর্তমানে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ঘাটতির উৎস, প্রকৃত পরিমাণ এবং চলতি বছর ইউক্রেনকে আরও অর্থ দেওয়া হবে কি না, তা যাচাই করছেন। প্রয়োজনে কীভাবে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হবে, সেটিও তারা বিবেচনা করছেন।

ইউক্রেনের আকস্মিক অর্থের চাহিদা মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় অর্থ কিয়েভের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারকে ইউক্রেনকে সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের অগ্রাধিকারও বিবেচনা করতে হচ্ছে। তা না হলে ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাশিয়ার অব্যাহত হামলায় ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। রুশ হামলায় দেশটির বন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বড় একটি রাজস্ব উৎস কমে গেছে। একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইউক্রেনে গুরুতরভাবে কমে গেছে। নিজেদের বিকল্প অস্ত্রের উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানোরও চেষ্টা করছে কিয়েভ।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ওলেনা প্রোকোপেনকো বলেন, যুদ্ধের ব্যয় বাস্তবিক অর্থেই বেড়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেন যদি ইউরোপীয় দেশগুলোকে বোঝাতে পারে যে তাদের সত্যিই এই অর্থ প্রয়োজন, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থেও অর্থ দেওয়ার একটি উপায় খুঁজে নেবে।

ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতির কারণ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। গত মাসে কিয়েভে জেলেনস্কি বলেন, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের দায়িত্ব পালনের সময় কিছু অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। ফেদোরভ প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। সম্প্রতি তাকে বরখাস্ত করা হয়। তার বরখাস্তের পর ইউক্রেনে রাস্তায় বিক্ষোভও হয়।

গত ২৪ আগস্ট ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ নেতাদের এক বৈঠকে জেলেনস্কি বলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় চলতি বছরের শেষের জন্য বাজেটে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহার করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোট ঘাটতির পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ফেদোরভ তাঁর দায়িত্বের সময় এত বড় ঘাটতি ছিল বলে অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এই ঘাটতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন নেতৃত্বের অধীনে নেওয়া প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউক্রেন এখনো স্বল্পমেয়াদি বাজেটের প্রয়োজনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে গত মাসে সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, ঘাটতির মধ্যে অস্ত্র কেনা, সেনাদের বেতন এবং যুদ্ধে নিহত সেনাদের পরিবারের জন্য অর্থ দেওয়ার খরচ রয়েছে। ইউক্রেনের পার্লামেন্টের বাজেট কমিটির প্রধান রোকসোলানা পিদলাসা বলেন, চলতি বছরের শুরুতেই তাঁকে জানানো হয়েছিল যে প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হতে পারে। তবে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে সামরিক ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

পিদলাসা বলেন, যুদ্ধ প্রতিবছর আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। রাশিয়ার সামরিক কৌশল পরিবর্তনের কারণে ইউক্রেনের পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলেও তিনি জানান। তাঁর মতে, ইউক্রেনের শিল্প খাতে রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। এর মধ্যে ধাতব শিল্পের কারখানা এবং শস্য রপ্তানি করিডর রয়েছে। এর ফলে শুধু গত মাসেই ইউক্রেনের প্রত্যাশিত রাজস্বের প্রায় অর্ধেক হারিয়েছে দেশটি।

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেতস্কি আইনপ্রণেতাদের ব্যয় কমাতে কৃচ্ছ্রসাধনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সামরিক ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইউক্রেনের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ওলেকসান্দর মেরেজকো বলেন, সামরিক বাহিনীকে সহায়তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না, কারণ এটি ইউক্রেনের টিকে থাকার বিষয়। সেনাদের বেতন এবং তাদের পরিবারের জন্য দেওয়া অর্থ কমানো যাবে না বলেও তিনি জানান। এসব ব্যয়কে তিনি ইউক্রেনের জন্য ‘পবিত্র’ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

দ্রুত ঋণের অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব

ইউক্রেনের অর্থের ঘাটতি নিয়ে ইইউ এখন তা পূরণের উপায় খুঁজছে। ইইউর অর্থনীতি বিষয়ক কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস সোমবার ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেতস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন। বৈঠকের পর ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র বালাজ উজভারি বলেন, প্রথমে ইউক্রেনের বাজেট ও আর্থিক পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া প্রয়োজন।

জেলেনস্কি ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য ইইউর ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইউক্রেনের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ওই ঋণ এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত করে ইইউ। এর আগে এ নিয়ে দীর্ঘ ও কঠিন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ঋণের অর্থ দুই বছরে দেওয়ার কথা। ২০২৬ সালে অর্ধেক এবং ২০২৭ সালে বাকি অর্ধেক অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আট ইউরোপীয় কূটনীতিক ও কর্মকর্তা মনে করছেন, ইউক্রেনকে দ্রুত অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ঋণের অর্থ নির্ধারিত সময়ের আগেই ছাড় করা সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন একটি পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন বাড়ছে।

আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকের পর বলেন, ইইউ ইউক্রেন সাপোর্ট লোনের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া অব্যাহত রাখবে এবং যেখানে সম্ভব, প্রয়োজন অনুযায়ী সেই অর্থ আগেই দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তারা কেবল এখনই ইউক্রেনের অর্থের ঘাটতির প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করছেন। তাছাড়া ঋণের অর্থ আগেই ছাড় করলে আগামী বছরের জন্য ইউক্রেনের হাতে কম অর্থ থাকবে।

রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ ব্যবহারের দাবি

ইউক্রেন ইইউকে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ জব্দ করে তা ব্যবহারেরও আহ্বান জানিয়েছে। কিয়েভের মতে, এর মাধ্যমে দ্রুত আরও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। বেলজিয়ামে অবস্থিত আর্থিক আমানত সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ারে রাশিয়ার ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ জব্দ রয়েছে।

গত বছর ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ওই অর্থকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ইউক্রেনকে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশের বিরোধিতায় পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। এখন সুইডেনসহ ইইউর কয়েকটি দেশ আবার ওই পরিকল্পনা সামনে আনার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো জাতীয় বাজেট থেকে অর্থ ব্যয় না করে রাশিয়ার জব্দ করা অর্থকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ইউক্রেনকে সহায়তা করা।

তবে আগের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান বাধাগুলো এখনো রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেলজিয়ামের আপত্তি। বেলজিয়ামের আশঙ্কা, কোনো বিদেশি দেশের সম্পদ জব্দ করা হলে তা ইউরোপের আর্থিক ব্যবস্থায় সংকট তৈরি করতে পারে। এতে এমন বার্তা যেতে পারে যে রাজনৈতিক কারণে বিদেশি অর্থও জব্দ করা সম্ভব। এর ফলে আমানতকারীরা ইউরোক্লিয়ারসহ ইউরোপের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের অর্থ তুলে নিতে পারেন।

ইউরোক্লিয়ার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এই বাধাগুলোর কারণে জব্দ করা রাশিয়ার অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে কোনো চুক্তি হলেও তাতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আদৌ এ বিষয়ে সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সম্প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি জব্দ করা রাশিয়ার সম্পদ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব সম্পদকে শুধু ভবিষ্যতের আলোচনায় দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে না দেখে এখনই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সিবিহা বলেন, ‘আলোচনা কোথাও ভবিষ্যতে হবে, কিন্তু অর্থ প্রয়োজন এখনই।’

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস