কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্সের একটি আদালত। ১৯৯৮-৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধের সময় কসোভো লিবারেশন আর্মির (কেএলএ) জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ ও বেআইনি আটকের ঘটনায় থাচিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানায়, ৫৮ বছর বয়সী থাচি ছাড়াও কেএলএ-র আরও তিন সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা—কাদরি ভেসেলি, রেক্সহেপ সেলিমি ও ইয়াকুপ ক্রাসনিচি—দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ক্রাসনিচিকে ২৫ বছর, ভেসেলিকে ১৮ বছর এবং সেলিমিকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চারজনই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে—চার সাবেক কমান্ডার ৯৬টি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ৩৮৫ জনকে বেআইনিভাবে আটক, ৩০৩ জনকে নির্যাতন এবং প্রায় ৫০ জনের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনায় দায়ী। বিচারক চার্লস স্মিথ বলেন, থাচি তাঁর অবস্থান, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও প্রভাব ব্যবহার করে এসব অপরাধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এবং সেগুলোকে উৎসাহিত করেছেন।
তবে আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। বিচারকদের মতে, এসব অপরাধ বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ ছিল—এমন প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
থাচির বিরুদ্ধে মামলাটি কয়েক বছর ধরে চলেছে। কসোভোয় এ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতাও ছিল। এই রায়কে ‘মহা অবিচার’ বলে অভিহিত করেছে থাচির রাজনৈতিক দল পিডিকে। দলটির দাবি, মামলায় ব্যবহৃত কিছু অভিযোগ ও নথি মনগড়া এবং সার্বিয়ার প্রচারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় হাজার হাজার মানুষ বড় পর্দায় রায়ের ঘোষণা দেখেন। রায় ঘোষণার পর অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং কেএলএ-র আলবেনীয় সংক্ষিপ্ত নাম ‘ইউসিকে’ স্লোগান দিতে থাকেন।
যুদ্ধের সময় ‘কমান্ডার স্নেক’ নামে পরিচিত থাচি কেএলএ-র রাজনৈতিক শাখার অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং কসোভোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে কসোভোর প্রেসিডেন্ট হন। তবে অভিযোগের মুখে প্রায় ছয় বছর আগে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে দ্য হেগে বিচার মোকাবিলা করেন।
থাচির বিচার চলাকালে তাঁর আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, কোনো বাহিনী নয় বরং কেএলএ ছিল পুরোপুরি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে স্থানীয় ইউনিটগুলোর অপরাধের জন্য থাচির মতো জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাকে দায়ী করা যায় না। থাচিও আদালতে বলেছিলেন, তিনি কসোভোর মানুষের স্বাধীনতা, জীবন ও মর্যাদা রক্ষার পক্ষে ছিলেন।
আদালত স্পষ্ট করেছেন, এই বিচার কেএলএর স্বাধীনতার লক্ষ্য বা যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের সময় সংঘটিত নির্দিষ্ট অপরাধের দায় নির্ধারণের জন্য।
১৯৯৮-৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই জাতিগত আলবেনীয়। ন্যাটোর ৭৮ দিনের বিমান হামলার পর যুদ্ধের অবসান ঘটে। সংঘাতের সময় প্রায় ১০ লাখ জাতিগত আলবেনীয় কসোভোভান নিজ ঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। থাচি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।