হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী এএফডির জয়, বড় ধাক্কা চ্যান্সেলরের দলে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতা না পেলেও জয় পেয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জয় পেয়েছে। এমনটাই উঠে এসেছে বুথফেরত জরিপে। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম এআরডির প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, এএফডি ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিপরীতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎজের মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সিডিইউর তুলনায় এএফডির ভোট দ্বিগুণেরও বেশি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এএফডির প্রধান প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ড বলেন, ‘আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, ঠিক সেটিই অর্জন করেছি। এই রাজ্যে আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি।’ এএফডির নেত্রী অ্যালিস ভাইডেলও এই ফলকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। এই ফল এএফডিকে সরকার পরিচালনার স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে দলটি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।

গতকাল রোববার রাতে নির্বাচনের ফল নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎজ। স্থানীয় সময় রাত ১০টার পর তিনি সিডিইউর প্রধান কার্যালয় কনরাড-আডেনওয়ার-হাউস থেকে বেরিয়ে যান।

পূর্ব জার্মানির ম্যাগডেবুর্গ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ডমিনিক কেইন বলেন, ‘বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, এই নির্বাচনে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজ্যটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো যথেষ্ট আসন তারা পেয়েছে কি না, সেটিই প্রশ্ন। এই মুহূর্তে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।’

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, রাজ্য পার্লামেন্টের মোট ৮৩টি আসনের মধ্যে এএফডি ৩৯টি আসন পেতে পারে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪২টি আসন। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে এএফডি তিন আসন দূরে রয়েছে। জিগমুন্ড বলেন, রাজ্যে মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক সব দলের প্রতি তিনি সহযোগিতার হাত বাড়াতে চান। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, এএফডি অন্য দলগুলোর ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে না।

জার্মানির ১৬টি রাজ্যের কোনো একটিতেও এখন পর্যন্ত এএফডি কোনো সরকার গঠনকারী জোটের অংশ হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারেও দলটি কখনো অংশ নেয়নি। কারণ মূলধারার সব দলই এএফডির সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এই নীতিই জার্মান রাজনীতিতে ‘ফায়ারওয়াল’ নামে পরিচিত।

এএফডির জাতীয় সহ-নেতা টিনো ক্রুপালা দাবি করেন, এই ফল প্রমাণ করে যে ভোটাররা ক্ষমতাসীন জোটের নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এআরডিকে বলেন, ‘মূলধারার দলগুলোকে ভোট দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথবা বলা যায়, ভোটাররা একটি স্পষ্ট রায় দিয়েছেন। আর আমি শুধু তাদের এই রায় স্বীকার করার আহ্বান জানাতে পারি যে, আজ ভোটাররা “ফায়ারওয়াল”কে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।’

স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির শাখাকে রাজ্যটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা একটি নিশ্চিত ডানপন্থী চরমপন্থী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে এএফডি এই শ্রেণিবিন্যাস প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ম্যার্ৎজের কর্তৃত্বে আরেক ধাক্কা

রোববারের এই ফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎজেরের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে তার জোট সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন তার জনপ্রিয়তাও কমে গেছে। তাঁর মধ্য-ডানপন্থী সিডিইউ নির্বাচনে অনেক পিছিয়ে দ্বিতীয় হয়েছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের বর্তমান রাজ্যপ্রধান ও সিডিইউ নেতা সভেন শুলৎসে এএফডিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, এই ফল তাঁর দলের জন্য বড় আঘাত। তিনি বলেন, ‘এই ফলের সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিয়ে বাঁচতে হবে।’ শুলৎসে বলেন, তিনি এএফডির সঙ্গে সহযোগিতা করার কোনো পরিকল্পনা করছেন না। তবে শুরুতে তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, সিডিইউর ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি বহাল থাকবে কি না, তখন তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

পার্লামেন্টে আসনের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী সরকার গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। শুলৎসে চাইলে কয়েকটি দলকে নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে সিডিইউ ঐতিহ্যগতভাবে এএফডি এবং বামপন্থী দল ডি লিঙ্কে, উভয়ের সঙ্গেই আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এএফডি সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া বা অতীতের স্মৃতির টানকে কাজে লাগিয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের কয়েক দশক পরও পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে বিদ্যমান সম্পদের ব্যবধান নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভকেও দলটি কাজে লাগিয়েছে।

স্থানীয়দের মধ্যে থাকা কখনো কখনো প্রতিবাদী ‘অসি প্রাইড’ বা পূর্ব জার্মান পরিচয়ের গর্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এএফডির প্রার্থী জিগমুন্ড প্রায়ই পূর্ব জার্মানিতে তৈরি সিমসন শোয়ালবে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। রোববার নিজের শহর ট্যাঙ্গারমুন্ডেতে ভোট দিতে যাওয়ার সময়ও তিনি তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ওই মোটরসাইকেলেই ভোটকেন্দ্রে যান।

জিগমুন্ডকে এএফডির ‘বন্ধুত্বপূর্ণ মুখ’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল বেশ কড়া। এর মধ্যে ছিল ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই নথিবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘পুনর্বাসন ও নির্বাসন অভিযান’ শুরু করার প্রতিশ্রুতি।

এএফডির কর্মসূচি

এএফডির ‘অতি-উদার’ বা ‘ওয়োক’ রাজনীতিবিরোধী কর্মসূচির মধ্যে আরও রয়েছে সরকারি স্কুলগুলোতে এলজিবিটিকিউ প্রাইডের রংধনু পতাকার পরিবর্তে জার্মানির জাতীয় পতাকা ব্যবহার করা এবং ইতিহাস শিক্ষায় হিটলারের তৃতীয় রাইখের ওপর গুরুত্ব কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি। বিদেশি শ্রমিকদের জায়গা পূরণ করতে এএফডি বিদেশে বসবাসরত জার্মান নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে চায়। পাশাপাশি জনসংখ্যা কমে যাওয়া ঠেকাতে ২১ লাখ মানুষের ছোট এই রাজ্যের পরিবারগুলোকে ‘শিশু বোনাস’ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।

জার্মান ইকোনমিক ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, এএফডির অভিবাসন নীতি স্যাক্সনি-আনহাল্টের জন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ হতে পারে। কারণ রাজ্যটি বিদেশে জন্ম নেওয়া শ্রমিকদের ওপর, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে, ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এদিকে আরও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এএফডির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতর থেকে সংবেদনশীল তথ্য রাশিয়ার কাছে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। আর সেই তথ্য মস্কো জার্মানিকে অস্থিতিশীল করতে ব্যবহার করতে পারে। থুরিঙ্গিয়া রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেওর্গ মায়ার দৈনিক পত্রিকা হ্যান্ডেলসব্লাটকে বলেন, ‘রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য জার্মানিকে অস্থিতিশীল করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এএফডি, এই বিষয়টি ক্রেমলিন গোপনও করে না।’