পোল্যান্ডের সীমান্তের কাছে ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পর কিয়েভকে আরও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে। গতকাল সোমবার রুটে বলেন, ৩২ দেশের সামরিক জোট রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভকে সমর্থন দেওয়া থেকে পিছিয়ে যাবে না। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে পূর্ব সীমান্তজুড়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করবে ন্যাটো।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোপ্রধানের এই বক্তব্যের সময় পোল্যান্ডও ইউক্রেনের সঙ্গে নিজেদের সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর আগে, গত রোববার ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলা হয়। আরেকটি হামলা হয় আরও একটি সীমান্ত পারাপারের স্থানটির কাছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ট্রেনটিতে হামলার কয়েক মিনিট আগে ওই স্টেশন দিয়ে একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল যাওয়ার পর হামলাটি হয়। ওই প্রতিনিধিদলে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্টও ছিলেন।
ব্রাসেলসে ন্যাটোর রাজনৈতিক সদর দপ্তরে রুটে গতকাল সোমবার বলেন, ‘গতকাল (রোববার) ন্যাটো ভূখণ্ডের কাছাকাছি ইউক্রেনের ট্রেনে হামলাগুলো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে পুতিন কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছেন এবং ভয় ও সন্ত্রাস ছড়াতে তিনি কতটা আগ্রহী। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গিয়ে রাশিয়া ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।’
সোমবার পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ জানান, পোলিশ সেনাবাহিনী বাল্টিক সাগর থেকে রাশিয়ার একটি সামরিক ড্রোন বলে ধারণা করা হচ্ছে এমন একটি ড্রোনও উদ্ধার করেছে। ড্রোনটি উপকূলীয় গ্রাম ইয়ারোস্লাভিয়েকের কাছে পাওয়া যায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেন, পোলিশ সীমান্তের কাছে এসব হামলার উদ্দেশ্য ‘পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেনকে সমর্থন করা থেকে ভয় দেখিয়ে বিরত রাখা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখাতে হবে যে আমরা ইউক্রেনের পাশে আছি এবং আমরা ভয় পাইনি।’
ট্রেনে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রুশ বাহিনী ‘ইউক্রেনের পুরো ভূখণ্ডজুড়ে’ অভিযান চালাচ্ছে এবং তারা তা চালিয়ে যাবে।
রোববার পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী দোনাল্দ তুস্ক সতর্ক করে বলেন, মস্কো ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্ত লক্ষ্য করে তাদের অভিযান আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ওয়ারশতে নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকের পর তুস্ক বলেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাস রাশিয়ার পক্ষ থেকে অত্যন্ত তীব্র তৎপরতার সময় হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই উত্তেজনা আমাদের ভূখণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে, এমন সম্ভাবনা আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।’
পোলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোতে, যার মধ্যে গত সপ্তাহে সিআইএর দেওয়া একটি ব্রিফিংও রয়েছে, বলা হয়েছে রাশিয়া সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হামলা চালাতে পারে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ভেতরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে পারে। ইউক্রেনকে সমর্থন করা থেকে এসব দেশকে নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রাশিয়া এমন পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তুস্ক বলেন, সম্ভাব্য যৌথ প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিয়ে তিনি ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প আবারও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে সক্রিয় করার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। তবে যুদ্ধের বিষয়ে তিনি রাশিয়ার বয়ানের প্রতি ঝুঁকে আছেন বলেও ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি করছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশেষ করে ডিজেল জ্বালানির দাম আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার তেল পরিশোধন অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ইউক্রেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না করতে সম্মত হয়েছে। রাশিয়াও একই কাজ করতে সম্মত হয়েছে!’ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের মধ্যেও ট্রাম্প বলেছেন, ডিজেল জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধকেই মনে করেন। তবে রাশিয়া বা ইউক্রেন, কোনো পক্ষই ট্রাম্পের এই দাবি নিশ্চিত করেনি।
সোমবার রুশ বাহিনী কৃষ্ণসাগরে দুটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সোমবার বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে উত্তেজনা কমানোর কোনো পদক্ষেপ ‘শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ’ হতে পারে। তিনি বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার ওপর হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত, যদি তাদের মিত্ররা নিশ্চিত করে যে মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা, অবকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহের পথগুলোতে হামলা করা থেকে বিরত থাকবে।
ইউক্রেনের নেতা এর আগেও বলেছিলেন, একে অপরের ওপর হামলা বন্ধ রাখার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের দিকে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে ক্রেমলিন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ইউক্রেনকে ভূখণ্ড হস্তান্তর করতে হবে এবং সামরিক সক্ষমতা কমাতে হবে। এরপরই হামলা বন্ধের বিষয়টি কার্যকর হতে পারে বলে রাশিয়া বারবার জানিয়ে আসছে।