হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

রাজার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করা ইংল্যান্ডের সেই দাসীর ভাগ্যে যা ঘটেছিল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

এলিজাবেথ বার্টনের পোর্ট্রেট। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের একজন গৃহপরিচারিকা এলিজাবেথ বার্টন। ষোড়শ শতকে নানা ভবিষ্যদ্বাণী করে সাধারণ মানুষের চোখে তিনি সাধ্বীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। ওই সময়ের অনেক ধর্মীয় নেতাও তাঁর পরামর্শ নিতেন, এমনকি রাজা অষ্টম হেনরিও তাঁর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু রাজাকে নিয়ে করা একটি ভবিষ্যদ্বাণীই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসি দিয়ে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়। ইতিহাসে তিনি পরিচিত ‘হোলি মেইড অব কেন্ট’ বা ‘কেন্টের পবিত্র দাসী’ নামে।

১৫২৫ সালে ইংল্যান্ডের কেন্টের একটি ছোট গ্রামে এলিজাবেথ বার্টন হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থতার ঘোরে তিনি বাইবেলের বিভিন্ন অংশ আবৃত্তি করতেন। কখনো কখনো অচেতন হয়ে যেতেন। জ্ঞান ফিরে বিভিন্নরকম ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। আশপাশে এমন কথা রটে যায় যে, বার্টন যা বলেন তাই সত্য হয়। দ্রুত তাঁর এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁকে দেখতে মানুষের ঢল নামে।

ইতিহাসবিদেরা বলেন, একদিন টানা কয়েক ঘণ্টা অচেতন অবস্থায় থাকার পর হঠাৎ বার্টন সুস্থ হয়ে ওঠেন বার্টন। ওই ঘটনার পর তাঁকে ‘ঈশ্বরপ্রেরিত দৈবদ্রষ্টা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন নথিতে প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে তাঁর চেহারা বর্ণনা পাওয়া যায়। জানা যায়, সুস্থ হওয়ার পর বার্টনের মুখমণ্ডল অস্বাভাবিকভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে ছিল এবং চোখ দুটি যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসছিল।

এরপর বার্টন ক্যান্টারবারির একটি আশ্রমে যোগ দেন। নানান ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি টিউডর আমলের ইংল্যান্ডে ব্যাপক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা, অভিজাত ব্যক্তি এবং রাজা অষ্টম হেনরিও তাঁর পরামর্শ নিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে এবং সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বার্টনের উত্থান এমন এক সময়ে ঘটে, যখন ইউরোপজুড়ে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব ইংল্যান্ডেও ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের বিস্তার ক্যাথলিক চার্চের সম্পদ ও পোপের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল। এতে ক্যাথলিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই বার্টনকে ঈশ্বরের বাণীবাহক মনে করে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী মুখে মুখে ও লিখিত আকারে ছড়িয়ে দিতে থাকেন।

‘হিরোইনস অব দ্য টিউডর ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের লেখক শ্যারন বেনেট কনোলি বলেন, বার্টনের ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা বাস্তব ছিল কি না, সেটি বড় বিষয় না। মানুষ তাঁর কথাকে বিশ্বাস করত।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তিনি বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিরও আস্থা অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরির প্রধান উপদেষ্টা কার্ডিনাল উলসি এবং ক্যান্টারবারির যাজক। পরে তাঁর কথা পৌঁছে যায় রাজদরবারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি স্যার টমাস মোরের কাছেও। মোর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, বহু বছর ধরে তাঁর অসাধারণ গুণের কথা শুনে এসেছেন এবং তা নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন।

তবে পরে টমাস মোর তাঁকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন, যেন তিনি কখনো রাজা বা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বলেন।

রাজা হেনরিও শুরুতে বার্টনের প্রতি অনুকূল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একাধিকবার সাক্ষাৎ হয় এবং ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। কিন্তু পরে রাজা যখন স্ত্রী ক্যাথরিন অব অ্যারাগনকে তালাক দিয়ে নতুন বিয়ে করেন (উত্তরাধিকারীর আশায়), তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।

ক্যাথলিক ধর্মমতে বিবাহবিচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য ছিল না। বার্টনও এই বিবাহবিচ্ছেদের বিরোধিতা করেন এবং ক্যাথরিনের প্রতি সমর্থন জানান। এমনকি তিনি পোপ ক্লেমেন্টকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন, ক্যাথরিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে মহামারি দেখা দেবে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ক্যাথলিক চার্চের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশ্বাস করতেন, বার্টন রাজাকে প্রভাবিত করতে পারবেন এবং তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবেন। এ কারণে অনেকে মনে করেন, বার্টনকে ক্যাথলিক চার্চ রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করেছিল।

ইউনিভার্সিটি অব সারির অধ্যাপক ডায়ান ওয়াট বলেন, তাঁকে প্রতারক বা অন্যের হাতের পুতুল হিসেবে দেখানোর ধারণা মূলত তাঁর বিরোধীরাই তৈরি করেছিলেন। তাঁর মতে, বার্টন ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।

ওয়াট আরও বলেন, মধ্যযুগীয় ইউরোপে এমন বহু নারী ছিলেন, যাঁরা ধর্মীয় দর্শন বা অলৌকিক ক্ষমতার কারণে রাজা ও পোপের মতো ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। তবে বার্টনের বিশেষত্ব ছিল, তিনি ধর্মীয় নয়, সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁর সামাজিক অবস্থান। তিনি ছিলেন একজন গৃহপরিচারিকা। সে সময় সাধারণ নারীদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না। কিন্তু অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষমতা তাঁকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছিল।

এরপরই তিনি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীটি করেন। বার্টন বলেছিলেন, ঈশ্বর তাঁকে জানিয়েছেন—রাজা যদি আবার বিয়ে করেন, তাহলে সাত মাসের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হবে। পরে তিনি আরও বলেন, রাজা বিয়ে করলে এক মাসের মধ্যেই তাঁর রাজত্ব হারাবেন।

এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৩৫১ সালের ট্রিজন অ্যাক্ট রাষ্ট্রদ্রোহ আইন অনুযায়ী, রাজার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করাও গুরুতর অপরাধ ছিল।

১৫৩২ সালের অক্টোবরে রাজা হেনরি ও অ্যান বোলিন ক্যালেতে (রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী) যাওয়ার পথে ক্যান্টারবারিতে বার্টনের সঙ্গে দেখা করেন। রাজা তাঁকে একটি আশ্রমের প্রধান করার প্রস্তাব দেন, যদি তিনি তাঁর বিয়ে নিয়ে আর কিছু না বলেন। অ্যান বোলিনও তাঁকে নিজের বাড়িতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বার্টন দুই প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর ১৫৩৩ সালের জানুয়ারিতে রাজা অ্যান বোলিনকে বিয়ে করেন। এক সময় বোঝা যায়, বার্টনের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয়নি।

পরে তাঁকে লন্ডন টাওয়ারে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন রাজার নতুন প্রধান উপদেষ্টা থমাস ক্রমওয়েল। সেখানে বার্টন স্বীকার করেন, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ঈশ্বরপ্রদত্ত ছিল না।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই স্বীকারোক্তি তিনি স্বেচ্ছায় করেছিলেন, নাকি চাপের মুখে—তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। একইভাবে তিনি সত্যিই ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা পেয়েছিলেন, নাকি সবই অভিনয় ছিল, সেটি আজও অমীমাংসিত।

১৫৩৪ সালের ২০ এপ্রিল বার্টন ও তাঁর ছয়জন অনুসারীকে টাইবার্নে ফাঁসি দিয়ে পরে শিরশ্ছেদ করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর।

এরপর তাঁর কাটা মাথা লন্ডন ব্রিজের দক্ষিণ প্রবেশপথে খুঁটির মাথায় ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহীদের জন্য প্রচলিত শাস্তি ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এলিজাবেথ বার্টনই একমাত্র নারী, যার মাথা এভাবে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়েছিল।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নিজের লেখা কিংবা তাঁর অনুসারীদের কোনো তথ্য সংরক্ষিত হয়নি। থমাস ক্রমওয়েল তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে লেখা প্রায় ৭০০ কপি বই জব্দ করে ধ্বংস করে দেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত আরেকটি পুস্তিকাও নষ্ট করা হয়।

ফলে আজ ইতিহাসে বার্টনকে নিয়ে যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই সরকারি নথি এবং তাঁর বিরোধীদের লেখা থেকে। এ কারণে তাঁকে প্রতারক হিসেবে দেখানোর প্রবণতাই দীর্ঘদিন ইতিহাসে প্রাধান্য পেয়েছে।

তবে আধুনিক গবেষকেরা মনে করেন, এলিজাবেথ বার্টনের প্রকৃত কাহিনি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। একদিন যদি তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যদ্বাণীর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হয়, তাহলে হয়তো ইতিহাস তাঁকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করবে।

স্পেনে ঢুকে পড়া অভিবাসীরা আবারও মরক্কো ফিরে যাচ্ছে

হঠাৎ মরক্কো থেকে কেন স্পেনে অভিবাসীর ঢল, এক দিনে ঢুকল ৪৯ হাজার

মরক্কো থেকে ১০ দিনে দুই হাজার লোক ঢুকেছে স্পেনে, ৯ জনের মৃত্যু

গরমে ঘামছে ইউরোপ—দাবানলে পুড়ছে ফ্রান্স, স্পেন ও গ্রিস

হালকা নীল পোশাকে ক্যাটি আর বোতাম খোলা শার্টে দেখা গেল ট্রুডোকে

ইউক্রেনে রুশ হামলায় নিহত ৮, আঘাত ঠেকাতে যুদ্ধবিমান পাঠাল পোল্যান্ড

বাইক দুর্ঘটনায় অস্কারজয়ী সংগীতশিল্পী গ্লেন হ্যানসার্ডের মৃত্যু

কাস্পিয়ানের প্রতিশোধ নিতে ইউক্রেনের বন্দরে হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইরান

টেলিগ্রাম প্রতিষ্ঠাতা দুরভের বিরুদ্ধে রাশিয়ার মামলা

কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, আটকে পড়েছেন ১৩ ভারতীয় নাবিক